বিশ্বের একটি জটিল সংক্রামক ব্যাধি হচ্ছে যক্ষ্মা। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়_ বরং উন্নয়নশীল ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে এ দেশে যক্ষ্মা বা টিবি রোগের মাত্রা বা প্রকোপ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সাধারণত বন্ধ, স্যাঁতসেঁতে, ঘনবসতিপূর্ণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যেই এ রোগের প্রকোপ বেশি। যক্ষ্মা বা টিবির জীবাণুর সংক্রমণ বৈশিষ্ট্যের কারণেই এমনটা হয়। এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতার মাত্রা কম থাকায় এ রোগের বিভিন্ন লক্ষণ বা উপসর্গ সম্পর্কে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর সিংহভাগেরই তেমন ভালো কোনো ধারণা নেই। বাংলাদেশ জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নিয়তই এ সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে এ কর্মসূচিকে আরো ত্বরান্বিত ও গতিশীল রাখতে সহায়তা করে যাচ্ছে।
মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস নামক জীবাণু যক্ষ্মা বা টিবি রোগের জন্য দায়ী। এ জীবাণু শ্বাসের সময় শ্বাসনালির মাধ্যমে মানবদেহে সংক্রমিত হয় এ জন্য যক্ষ্মা বা টিবি রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো ফুসফুসের সংক্রমণজনিত কারণে হয়। অধিকাংশ রোগীই দীর্ঘ সময়ের কাশি নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে কাশির সঙ্গে কফ বা রক্ত যাওয়া, সান্ধ্যকালিন বা রাত্রিকালিন হালকা জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা বুকের ব্যথা, খাবারে রুচি, দ্রুত শরীরের ওজন হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি নিয়েও যক্ষ্মা বা টিবি রোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন। অন্যান্য উপসর্গ নিয়ে রোগী এতটা ভীত না হলেও কাশির সঙ্গে রক্ত গেলে রোগী ভীত ও চিন্তিত হয়ে পড়েন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী এ ধরনের অধিকাংশ রোগী মনে করেন কাশির সঙ্গে রক্ত যাওয়া মানেই যক্ষ্মা বা টিবি রোগ হওয়া। সর্বদাই এ ধারণা সঠিক নয়, যক্ষ্মা বা টিবি রোগ ছাড়াও অন্য অনেক রোগ আছে যাতে কাশির সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসজনিত ফুসফুসের প্রদাহ বা ব্রোঙ্কাইটিস হলে কাশির সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। এটা কোনো ভীতিকর বা চিন্তা করার মতো কিছু নয়। নিউমোনিয়া হলেও কাশির সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। সাধারণত শিশু বা বায়োবৃদ্ধরা নিউমোনিয়া আক্রান্ত হন বেশি। তবে এটা ঠিক যে কফের সঙ্গে রক্ত পাওয়ার অন্যতম প্রধান দুটি কারণ হলো_ যক্ষ্মা বা টিবি ও ফুসফুসের ক্যান্সার। যক্ষ্মা বা টিবি রোগীর ক্ষেত্রে কফের সঙ্গে যাওয়া রক্তের পরিমাণ বেশি। কিন্তু ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রে অল্প অল্প করে দীর্ঘসময় ধরে কাশির সঙ্গে রক্ত যায়। ধূমপায়ী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। একজন মাঝবয়সী ধূমপায়ী ব্যক্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় ধরে কাশির সঙ্গে অল্প অল্প করে রক্ত গেলে সে ক্ষেত্রে ক্যান্সারের একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়। অন্যদিকে জনাকীর্ণ, বন্ধ স্যাঁতেসেঁতে পরিবেশ থাকা একজন মানুষের হঠাৎ করে কাশির সঙ্গে অনেক রক্ত গেলে তার ক্ষেত্রে যক্ষ্মার সম্ভাবনা আগে আসে। মানবদেহের বিভিন্ন স্থানে যেমন ফোঁড়া হয় তেমনি ফুসফুসেও ফোঁড়া হতে পারে। ফুসফুসের ফোঁড়া হলেও কাশি বা কফের সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। যক্ষ্মা বা টিবিসহ অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, ফুসফুসের ক্যান্সার কিংবা কিছু পরজীব জীবাণু যেমন অ্যামিবা দ্বারা ফুসফুসের ফোঁড়া হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির সাধারণত জ্বর, বুকে ব্যথা ও কাশি বা কফের সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। যক্ষ্মা বা টিবিসহ অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, ফুসফুসের ক্যান্সার কিংবা কিছু পরজীব জীবাণু যেমন অ্যামিবা দ্বারা ফুসফুসের ফোঁড়া হতে পারে। যক্ষ্মা বা টিভি ও ক্যান্সার ছাড়াও অন্য একটি রোগে অল্প থেকে বেশি পরিমাণে কাশি বা কফের সঙ্গে যেতে পারে এর নাম ব্রঙ্কিয়েকটেসিস। ফুসফুসের গঠনকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এ রোগটি সাধারণত ছোটবেলা কোনো প্রদাহ সঠিকভাবে চিকিৎসা না হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্রঙ্কিয়েকটেসিস রোগের সৃষ্টি হয়। এছাড়া কিছু জন্মগত রোগের ঘন ঘন প্রদাহজনিত জটিলতার কারণেও এ রোগের সৃষ্টি হতে পারে।
ব্রঙ্কিয়েকটেসিস রোগের যক্ষ্মা টিবি রোগের বেশকিছু মিল আছে যেমন_
রোগীর কফ বা কাশির সঙ্গে প্রচুর রক্ত নির্গত হওয়া;
গায়ে জ্বর থাকা;
কফ হলুদ হওয়া এবং বেশ দুর্গন্ধ হওয়া।
এছাড়া কিছু রক্তজনিত রোগের কারণেও কাশির সঙ্গে রক্ত যেতে পারে, যেমন_ হিমোফিলিয়া বা অনুচক্রিকাজনিত রোগ আইটিপি এসব ক্ষেত্রে কাশির সঙ্গে রক্ত যাওয়া ছাড়াও রোগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপসর্গ থাকতে পারে। কাজেই কাশি বা কফের সঙ্গে রক্ত যাওয়া মানেই যক্ষ্মা বা টিবি রোগ নয়। সাধারণত নিরাময়যোগ্য রোগ থেকে শুরু করে জটিল বিভিন্ন রোগে কাশি বা কফের সঙ্গে রক্ত যেতে পারে। তাই চিন্তিত বা ভীত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বক্ষব্যাধি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিসকরা সঠিকতর ও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা সহায়তা দিতে পারে। সুপারিশ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক রোগটি নির্ণয় করে বিচিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা সম্পন্ন করার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাশি বা কফের সঙ্গে রক্ত যাওয়া সমস্যার যোগ্য সমাধান পাওয়া সম্ভব।
বক্ষব্যাধি রোগ বিশেষজ্ঞ
সহকারি অধ্যাপক, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ
জাতীয় এ্যাজমা সেন্টার মহাখালী

Post a Comment
Facebook Disqus