না’গঞ্জে বেহাত হয়ে যাচ্ছে সওজের কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি




মোশতাক আহমেদ শাওন /  নারায়ণগঞ্জে বেহাত হয়ে যাচ্ছে সড়ক ও জনপথের কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি।
প্রভাবশালীরা এসব জায়গা দখল করে কারখানা, বহুতল ভবন, দোকানপাট, বিলবোর্ডসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছে। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ব্যাক্তিগত লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকাই সরকারী সম্পত্তি বেহাতের মূল কারন। বেদখল হয়ে যাওয়া ওইসব সম্পত্তি উদ্ধার করতে গিয়েও আইনী জটিলতাসহ নানাবিধ বাঁধার মুখে পরতে হচ্ছে সড়ক ও জনপথকে। নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের অধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশের অব্যবহৃত সম্পত্তিই বেশী দখল হয়ে গেছে। এরমধ্যে যাত্রাবাড়ী - কাঁচপুর ৮ লেন মহাসড়কের পার্শ্বের কয়েক শত কোটি টাকার সম্পত্তি গত কয়েক বছরে দখল করে নিয়েছে দখলদারেরা।
সরেজমিনে মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর অংশ সরেজমিনে ঘুরে অনুসন্ধানে জানাগেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাতুয়াইল এলাকায় মহাসড়কের পার্শ্বে প্রায় ৫০ শতাংশ জমি অবৈধ ভাবে দখল করে ২০১০ সালে এসবি গ্রুপ ফ্রিজিং কোল্ড ষ্টোরেজ নামক একটি শিল্প কারখানা গড়ে তুলেছেন জনৈক শাহজাহান বাবলু।
তিনি সরকারের প্রভাবশালী দু’জন মন্ত্রীর কাছের লোক বলে জানা গেছে। এই সম্পত্তির মূল্য বর্তমান বাজার দরে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। সাইনবোর্ড মোড়ের কয়েকশ’ মিটার পশ্চিমে মহাসড়কের উত্তর পার্শ্বে ৬০ শতাংশ জায়গা গত বছরের প্রথম দিকে দখল করে সেখানে একটি বহুতল ভিত্তি দিয়ে দোতলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘বরিশাল ভবন’। বাকী জায়গা ( মহাসড়কের উপরসহ) লোহার গ্রীল দিয়ে ঘেরাও করে নিজ দখলে রেখেছেন ওই দখলদার। এই সম্পত্তির দাম কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা। সাইনবোর্ড মোড়ে মহাসড়কের পাকা ঘেঁষে কয়েকশ’ ফুট জায়গা দখল করে দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে খাবারের হোটেল, টায়ারের দোকানসহ বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এর পেছনে পুকুর ও জমিসহ ৬ একরের বেশী জায়গাও দখল করে নেওয়া হয়েছে।
ময়নাল নামের সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা এই জায়গা দখল করেছেন। দখল করে নেওয়া এই জমির দাম কমপক্ষে ১৬০ কোটি টাকা। সানারপাড় থেকে মাদানীনগর পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকার মহাসড়কের উত্তর পার্শ্বের জলাশয় দেড় দশক ধরে অবৈধ ভাবে দখলে রেখে মাছ চাষ করছে শহীদুল ইসলাম। তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। এই জলাশয়ের পরিমান কয়েক একর। মৌচাক এলাকায় মাহসড়কের দক্ষিন পার্শ্বে স্যামস ফিলিং ষ্টেশনের সাথে প্রায় এক একর জমি দখলে নিয়ে দোকানপাট করে ব্যবসা করছে স্থানীয় কিছু লোক। তারা দুই যুগের বেশী সময় ধরে এই জমি দখল করে রেখেছেন। এই সম্পত্তির মূল্য হবে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।না’গঞ্জে বেহাত হয়ে যাচ্ছে সওজের কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি
কাঁচপুর সেতুর পশ্চিপার্শ্বে সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা প্রায় এক একর জায়গা দখল নিয়ে বালু ও পাথরের ব্যবসা করছে স্থানীয় যুবলীগের এক নেতা। ৫/৬ মাস ধরে ওই নেতা জায়গাটি দখলে নিয়েছে। গত সপ্তাহে ওই সীমানা প্রাচীরের কিছু অংশ দখলকারীর লোকজন ভেঙ্গে ফেলেছে। দখল হওয়া ওই সম্পত্তির পরিমান সাড়ে ৩ একর। এই জায়গার মূল্য প্রায় পৌণে ২শ’কোটি টাকা। মহাসড়কের যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত অংশেই শুধু এমন দখলের উৎসবের অবস্থা নয়। নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের আওতাধীন ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কে কাঁচপুর থেকে মেঘনা-গোমতী সেতু , ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে কাঁচপুর থেকে নরসিংদির সীমানা, ঢাকা বাইপাস মহাসড়কের মদনপুর থেকে কাঞ্চন সেতুর পশ্চিম পাড়, ঢাকা- নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড (আঞ্চলিক মহাসড়ক) পর্যন্ত মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কের উভয় পার্শ্বে কয়েক হাজার একর সড়ক ও জনপথের অব্যবহৃত জমি দখলদারের কবলে চলে গেছে। এসব সম্পত্তির মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও মহাসড়কগুলোর পার্শ্বে সওজের জায়গায় রয়েছে অনুমোদন বিহীন শতাধিক বিলবোর্ড। অবাক করার বিষয় সড়ক ও জনপথের নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের আওতাধীন কি পরিমান জমি বেদখল হয়ে গেছে সেই হিসাবও তাদের কাছে নেই। শুধু মাত্র সড়ক ও মহাসড়কের পার্শ্বে অস্থায়ীভাবে গড়ে ওঠা কিছু স্থাপনা মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ করা ছাড়া অন্যগুলির বিষয়ে কোন খোঁজ খবরই রাখেন না কর্তৃপক্ষ। গত বছরের ১৭ জুলাই মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছিল মহাসড়কের পার্শ্বে অনুমোদন বিহীন স্থাপিত অবৈধ সব বিলবোর্ড ১৫ দিনের মধ্যে অপসারন করে মন্ত্রণালয়কে জানাতে। কিন্তু গত ১০ মাসে একটি বিলবোর্ডও অপসারন করা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই দখল প্রক্রিয়ার সাথে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুযোগ সুবিধা গ্রহণের বিষয় রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রোশনি-এ ফাতিমা সওজের জায়গা দখল হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, অনেকে জায়গা দখল করে সওজের বিরুদ্ধে মামলা করে দেয়। মামলা শেষ করে তা ফিরে পেতে অনেক জটিলতায় পরতে হয়। তারপরও দখল হওয়া বিভিন্ন সম্পত্তি উদ্ধারে তিনি চেষ্টা করছেন বলেও জানিয়েছেন।

Post a Comment

Disqus