বর্তমান বার্তা ডট কম / ২৮/ মে ২০১৫/
আনোয়ার সাদী
মামার হাত ধরে নৌকায় উঠেছিলো মেয়েটি। ধরে নেই তার নাম লায়লা মানে রাত। নাম সন্ধ্যা হলেও কিছু আসতো যেতো না। তাতে তাকে বিষণ্ন মনে হত না মোটেও। গন্তব্য মালয়েশিয়া। সেখানে থাকে তাঁর হবু স্বামী। সম্পর্কে মামাতো ভাই। তাকে নিয়ে যেতে পাঁচ হাজার, মামাকে নিয়ে যেতে পাঁচ, মোট দশ হাজার রিঙ্গিত পরিশোধ করা হয়েছে দালালকে। আশপাশের আরো বেশ কিছু যুবতি এই পথেই গেছে স্বামীর কাছে। দুর্গম যাত্রায় বিরতি থাইল্যান্ডের জঙ্গলে। এবার দালাল চাইলো আরো টাকা। এত অল্প রিঙ্গিতে দুজন যেতে পারবে না। হবু স্বামীর সঙ্গতি নেই আরো দেওয়ার। কী আর করা, মেয়েটিকে আটকে রেখে তার মামাকে তুলে দেওয়া হলো মালয়েশিয়াগামী নৌকায়। অনেক পরে মেয়েটি পুলিশের কাছে ধরা পড়ায় গল্পটি আমাদের জানা হলো। সেই ক্যাম্পে অনেক মেয়েকে অন্ত:স্বত্বা দেখার কথাটিও আমাদের জানা হলো। শোনা হলো আরো দুই করুণ আর্তি, আঁরার দেশইত তো কোনো জোয়ান পোলা নাই। আরাকানে অবিবাহিয়্যা মাইয়্যা পোলার অনেক বিপদ। এটা শুধু একটা গল্প। এমন অসংখ্য অমানবিক, আইনহীন জীবনের গল্পের পেছনে একটাই শব্দ- এথনিক ক্লিনজিং। জাতিধরেই বিনাশ করে দেওয়ার পরিকল্পনা।
মায়ানমারের দাবি, আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলিমরা তাদের নাগরিক নয়। গেছে চট্টগ্রাম থেকে। বাংলাদেশ অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছে, আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলিমরা আছে শত শত বছর ধরে। বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে। কীভাবে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়? তারপরো নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের আইনহীন জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক মানুষের করুণ পরিণতি এখন আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত বিষয়।
থাইল্যাণ্ড ও মালয়েশিয়ার গণকবরগুলোতে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশিদের হাড়গোড়। বুক ফাটা আর্তনাদ বাংলাদেশের ১৯টি জেলার বেশ কিছু গ্রামের অনেক পরিবারে। অনেকে ফিরে এসে জানাচ্ছেন অমানবিক আরো গল্প। বলছেন, থাইল্যাণ্ডে নেমে মুক্তিপণ চায় দালালরা। দুর্গম যাত্রা পথে বেঁচে থাকার সফলতা যারা দেখাতে পারে, তারা আগের জীবনে ফিরতে পারে মুক্তিপণ দিয়ে। মাঝখানে টাকা ক্ষয়, ভোগান্তি, আইনহীন অধিকারহীন জীবন যাপন এবং সবচেয়ে বড় কথা দেশের মুখে কালি মেখে দেওয়ার কাজ শেষ হয় একই সঙ্গে।
বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে, ঘুমের মধ্যে হাত পা বেধে নৌকায় বিক্রি করে দেওয়ার গল্প আমাদের অতীতের দাস ব্যবসাকে মনে করিয়ে দেয়। এই নির্মর্মতা আইনহীন বর্বর জীবনকে সামনে টেনে আনে। অথচ, বাংলাদেশ নাগরিকদের দেখাচ্ছে ২০২১ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন। আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩১৪ মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের চেয়ে ১২৪ ডলার বেশি। এর মানে, মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশ ভালোভাবেই আছে। এর অপর দুই শর্ত অর্থনীতির সক্ষমতা ও মানব উন্নয়ন- সূচকে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করেছে বাংলাদেশ। কোনো কোনো খাতে অগ্রগতি ভারতের চেয়েও বেশী। যদিও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রহীনতা –গুম- খুনের লাগাতার অভিযোগ রয়েছে বিরোধী বিএনপি নেতৃত্বের ২০ দলীয় জোটের।
অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা থেকে অনুমান করতে হয় সাগর পথে অবৈধভাবে লোক পাঠানোর বিষয়টি সরকারের মনযোগে ছিলো না। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কর্মসংস্থানের এতো সুযোগ তৈরির পরও কেন ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। কথা শুনে মনে হয়েছে শেখ হাসিনা বিস্মিত। যারাই এই পাচারের কারিগর তারা শেখ হাসিনার শাসন আমলের অনেক ভালো আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামের পাশাপাশি একটা খারাপ আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামের জন্ম দিয়েছে। যে শিরোনাম বেদনাদায়ক। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন মানব পাচারকারীদরে গ্রেফতারের। পার পাবে না অবৈধ অভিবাসনের আশায় নৌকায় উঠা যাত্রীরাও। এখন দেখার বিষয় এই নির্দেশ কীভাবে কত দ্রুত পালন করে প্রশাসন।
বাংলাদেশের ১৯টি জেলার মানুষ পাচারকারীদের জালে পা দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সে সব জেলায় এরইমধ্যে পাচারকারীরা আত্মগোপনে চলে গেছে। কক্সবাজারে ‘বন্ধুকযুদ্ধে’ মারা গেছে পাঁচজন। মোবাইল ব্যাংকিং করে মুক্তপনের টাকা লেনদেনকারীদের কাউকে এখনো আমরা আইনের আওতায় আসতে দেখিনি। এই গেলো ডাঙ্গার কথা । এবার জলের কথা বলি। দেশী বিদেশী গণমাধ্যমের সুবাদে যতটুকু জানা যায়, প্রথমে মানুষকে তোলা হয় ছোট ছোট নৌকায়। তারপর বড় নৌকায়। তারপর হয়তো জাহাজে নয়তো নৌকায়। তীর থেকে জেলেদের নৌকা ছুটে যায় গভীর অগভীর সমুদ্রে। খালি গায়ে নৌকার ওপরে অল্প মানুষ বসে থাকলে , বেশী মানুষ ভেতরে আটকে রাখলে বোঝার কতটুকু উপায় থাকে যে ওরা জেলে না কি পাচারকারী?
যাহোক, শেষ পর্যন্ত মায়ানমারের এথনিক ক্লিংনজিং উদ্যোগের ফলে মানবিক বিপর্যয় আন্তর্জাতিক মহলের নজরে এলো। সুকি নিজে কথা না বললেও তার দলের একজন মুখপাত্র রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বিষয়ে কথা বলেছেন। মায়ানমারের মাথায় থাকবে মায়ানমারের ব্যথা। আমাদের উচিত আইনী পদক্ষেপ বা সচেতনতা বাড়ানো। যেকোনোভাবে নাগরিকদের আইনহীন জীবনের বাসিন্দা হওয়া ঠেকানো। আইন নিরাপত্তা দেয়, শান্তি দেয়। অপরাধের শাস্তিও দেয়। এমনকী আইন ফাঁসি দিয়ে মানুষও মারে । সে সবই শান্তি ও সম্মানের জন্য। আইনহীন পৃথিবী এক অসম্মানের পৃথিবী।

Post a Comment
Facebook Disqus