
নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ/ বর্তমান বার্তা ডট কম / ২৪ জুন ২০১৫ /একসময় পাল তোলা নৌকা শীতলক্ষা থেকে ব্রক্ষপুত্র নদে যাতায়াত করতো খাল দিয়ে। বিয়ের বরযাত্রা থেকে শুরু করে কাইকারটেক, সোনাকান্দা থেকে হাট- বাজার করে নৌকায় বাড়ী ফিরতো মানুষ। কয়েকবছর আগেও বালুর ট্রলার বা ছোটখাটো ট্রলার বা নৌকা চলাচল করতো এসব খাল দিয়ে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেসব সরকারী খাল এখন অস্তত্বিহীন। বন্দরে সিটি কর্পোরেশনের ভেতরে ৭টি এবং বাইরে আরও অন্তত ১০টি সরকারী ছোট বড় খাল চলে গেছে প্রভাবশালী অবৈধ দখলদারদের পেটে। রাজনৈতিক, ব্যবসায়ীক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী এসব অবৈধ দখলদাররা পুর্বপরিকল্পিতভাবে মাটি ভরাট করে দখল করে নিয়েছে ছোট বড় ১৭টি খাল। এসব খালের তালিকা বা দখলদারদের বিষয়ে কোন তথ্য নেই সিটি কর্পোরেশন বা সরকারী দপ্তরে। উপজেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস কেউই খোঁজ রাখেনি অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়া খালগুলোর। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বন্দরে ১০ বছর আগেও সিটি কর্পোরেশনের ভেতরে ও বাইরে কমপক্ষে ১৭টি খালের অস্তিত্ব ছিলো। তখন থেকে দখল প্রক্রিয়া শুরু হয়ে বর্তমানে সবকটি সরকারী খাল প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। দুএকটির অস্তিত্ব খুজে পাওয়া গেলেও সেগুলো আর খাল নেই ক্যানেলের চেয়েও সরু হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্দর উপজেলার সরকারী খালগুলো পর্যায়ক্রমে দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে মার্কেট, বাড়ীঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, ক্লাবঘর ইত্যাদী। শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশন এলাকায়ই ব্রক্ষ্রপুত্র নদ হতে শীতলক্ষা নদীতে যোগাযোগের ৭টি সরকারী খাল দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালীরা। এলাকাবাসীর দাবী বন্দরের সরকারী খালগুলো পুণঃরুদ্ধার করে জনস্বার্থে ব্যবহার করার জন্য। সরকারী খাল দখলদারের তালিকায় রয়েছে ইউপি চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর, জাতীয় পার্টি, আওয়ামীলীগ ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা। এছাড়া দেশের স্বনামধন্য শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্য দিবালোকে খাল ভরাট করে রাতারাতি ইন্ডাষ্ট্রীর অংশ করে নিয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, সোনাকান্দা দক্ষিন পাড়া পরিত্যাক্ত টেক্সটাইল মিলের সামনের সরকারি জলাশয় মাটি দিয়ে ভরাট করে জবর দখল করে নিয়েছে বিএনপির শীর্ষ সন্ত্রাসী ও বহু অপকর্মের হোতা শাহেনশাহ্। সোনাকান্দা ডক ইয়ার্ড থেকে মাহমুদ নগর পর্যন্ত সরকারি খালটি সম্পূর্ন ভরাট করে জবর দখল করে নিয়েছে আরেক বিএনপি নেতা গোলাম নবী মুরাদ, নিজাম, তাহের আলী। মদনগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী নমুনা বাজার খালটি প্রকাশ্য দিবালোকে দখল করে নিয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ। এ খাল দখলের সময় এলাকাবাসী বাধা দিলে উপজেলা প্রশাসন ড্রেজার আটক করে কাজ বন্ধ করে দেয়। একদিন পরই অদৃশ্য হাতের ইশারায় আবারও ড্রেজার চালু হয়ে রাতারাতি দখল হয়ে যায় নমুৃনা বাজার খালটি। বন্দর খানবাড়ী হতে কবরস্থান রোডের উত্তরে সরকারী খালটি প্রভাবশালীরা দখল করে বাড়ীঘর দোকানপাট নির্মাণ করেছে। এ খালের অস্তিত্ব বলতে এখন আর কিছু নেই। একরামপুর আরসিম এলাকা দিয়ে সরকারী খাল সিএসডি খালের সাথে মিলিত হয়েছিলো সেটিও দখল করে প্লট আকারে বিক্রি করে দিয়েছে প্রভাবশালীরা। নবীগঞ্জ এলাকার আরেক ঐতিহ্যবাহী সরকারী খাল দখল করে মার্কেট, ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে প্রভাবশালী ইউপি চেয়ারম্যান এহসান। একই খাল দকলদারের তালিকায় রয়েছে আরও প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। লক্ষন খোলায় সরকারী খাল ও রেলওয়ের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে কাউন্সিলর এনায়েতের বিরুদ্ধে। এছাড়া মীরকুন্ডি, সাবদী, কলাগাছিয়া এলাকায় একাধিক সরকারী খাল দখল করে রেখেছে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এসব সরকারী জমি রাজনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনের ঢিলেমীর কারনে দখল হয়ে গেছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। সরকারী জমি জবরদখলকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় উদ্ধারের কোন পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছেনা বলে স্থানীয়রা জানায়। এ নিয়ে স্ব স্ব এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সরকারী খাল দখলের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জের আলোকে বলেন, একটা সময় এসব খাল দিয়ে পাল তোলা নৌকা চলাচল করতো। আর এখন এসব খালের কোন অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায়না। এটা শুধু প্রশাসনের ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থতা আমাদেরও। আমরা এসব খালের অস্তিত্ব ধরে রাখা যায়নি। আমি সিটি কর্পোরেশনকে বলবো, সরকারী খাল উদ্ধারে নামুন আমরা সর্বাত্মকভাবে সহযোগীতা করবো। আমি আগেও বলেছি উন্নয়নের ক্ষেত্রে দলমত বলে আমার কাছে কিছু নেই। আর প্রশাসনকে বলবো, প্রস্তুত থাকুন সরকারী খাল উদ্ধারের জন্য। অচীরেই এব্যাপারে কঠোর ব্যাবস্থা। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী মোস্তফা কামাল মজুমদারের মোবাইল ফোনে সরকারী খাল উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মেয়রের অনুমতি ছাড়া কোন মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করেন। মেয়র আইভীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করার পরও তিনি রিসিভ করেননি। বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনারা নাজমিন এব্যাপারে বলেন, সরকারী খাল বা জমি দখলের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন তৎপর রয়েছে। কয়েকদিন আগে মাননীয় এমপি মহােদয়ের নির্দেশে মীরকুন্ডী এলাকা থেকে সরকারী খাল ভরাটের অভিযোগে মালিকসহ ৫ জনকে আটক করা হয়। পরে সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে দেখি ভরাটকারীরা খালের জায়গা বাদ রেখেই নিজেদের জমি ভরাট করছে। তাই কোন ব্যাবস্থা নিতে পারিনি। সরকারী খালের কোন তালিকা প্রশাসনের কাছে রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি এসিল্যান্ড নাহিদা বারিকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। এসিল্যান্ড নাহিদা বারিককে মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়নি।
Post a Comment
Facebook Disqus