বর্তমান বার্তা ডট কম / ১১ জুলাই ২০১৬ / জীবনের জন্য আমরা নানা ধরনের কাজ করি। শরীর ফিটনেস, খেলাধুলার জন্য আমদের দৌড়ানো হয়। কিন্তু এর সব প্রভাব পড়ে পায়ের উপর। শরীরের সকল ওজন ধরে রেখেছে এই পা। অথচ আমরা পায়ের যত্নে উদাসিন। আর এ উদাসিনতার কারণেই ভুগতে হয় পায়ের বিভিন্ন সমস্যায়। তার মধ্যে বেশিরভাগ দেখা দেয় পায়ের গোড়ালিতে ব্যাথা।    

পায়ের গোড়ালি ব্যথায় করণীয় :
পায়ের ২৬টি হাড়ের মধ্যে গোড়ালির হাড় সবচেয়ে বড়৷ যা শরীরের ওজন ধরে রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, হাঁটা-দৌড়নোর সময় পায়ের উপর যে চাপ পড়ে, সেই চাপের বেশির ভাগটাই বহন করে গোড়ালির হাড়৷ বিশেষজ্ঞদের দাবি, হাঁটার সময় পায়ের উপর শরীরের ওজনের ১.২৫ গুণ চাপ পড়ে৷ দৌড়ানোর সময় চাপ পড়ে ২.৭৫ গুণ৷ যার ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গোড়ালি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটা সময়ের পর ব্যথা শুরু হয়ে যায়৷

ব্যথার বিভিন্ন কারণ : 
১. প্লান্টার ফেসিয়াটিস লিগামেন্ট গোড়ালির হাড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে৷ এই লিগামেন্টে খুব বেশি চাপ পড়লে গোড়ালির সঙ্গে যুক্ত টিস্যুগুলি উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। যার ফলে ব্যথা হয়৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেকক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর বা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ব্যথাটা বেশি টের পাওয়া যায়৷
২. পায়ের পাতা ফ্ল্যাট হলে গোড়ালিতে ব্যথার সম্ভাবনা বাড়ে৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টিনএজারদের এই সমস্যা হয়৷ এই বয়সে গোড়ালির হাড় পূর্ণতা পায় না৷ খুব দ্রূত ক্ষয়ও হয়৷ যার ফলে ওই জায়গায় অনেক হাড় উৎপন্ন হতে থাকে যা থেকে ব্যথা হয়৷
৩. দীর্ঘদিন ধরে খুব শক্ত জুতো বা হাই হিল ব্যবহারেও গোড়ালিতে চাপ পড়ে৷ এতে গোড়ালির পিছন দিক থেকে অথবা গোড়ালির ভিতর থেকে ব্যথা অনুভূত হয়৷ পরে এই ব্যথা ক্রমশই বাড়তে থাকে৷
৪. পায়ের পিছনের দিকে নার্ভে খুব চাপ পড়লেও গোড়ালিতে ব্যথা হয়৷
৫. খুব বেশি এক্সারসাইজ, খেলাধুলো এবং হাঁটাচলা করে কাজ করলে গোড়ালির হাড়ে খুব চাপ পড়ে। যা থেকে হাড়ে চিড় ধরে৷ যাঁরা বেশি দৌড়াদৌড়ি করেন, তাঁদের এই কারণে গোড়ালিতে ব্যথা হয়৷ অস্টিওস্পোরোসিস থাকলেও গোড়ালিতে যন্ত্রণা হয়৷
৬. বিভিন্ন অসুখ থেকে হিল পেনের সমস্যা দেখা দেয়৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৭-১৫ বছরের বাচ্চাদের এই কারণে গোড়ালিতে ব্যথা হয়৷
৭. হাঁটার সময় ঠিকভাবে পা না ফেললে, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস থাকলে, ডায়াবেটিস থেকে নিউরোপ্যাথির সমস্যা থাকলে, হাড়ের মধ্যে ইনফেকশন অর্থাত্‍ রক্তে ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে গেলে, বোন সিস্ট থাকলেও হিল পেন হয়৷

লক্ষণ :
১. সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ব্যথা হওয়া! প্রথমে মাটিতে পা দিলেই খুব লাগে৷ তার পর কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করলে পা ঠিক হয়ে যায়৷
২. কাফ-মাসল পেনের ক্ষেত্রে ব্যথা সারা দিন থাকে না৷ রাত্রে ঘুমোনোর সময় এই ব্যথা বাড়ে৷

কখন ডাক্তার দেখাবেন : 
১. গোড়ালি ফুলে গেলে৷
২. জ্বরের সঙ্গে গোড়ালিতে ব্যথা হলে৷ অনেক সময় জ্বরের মধ্যে গোড়ালি অসাড় হয়েও যেতে পারে।
৩. হাঁটার সমস্যা হলে, পা ভাঁজ করতে অসুবিধা হলে, পায়ের পাতায় ভর দিয়ে দাঁড়াতে সমস্যা হলে৷
৪. এক সপ্তাহের বেশি গোড়ালিতে ব্যথা থাকলে, চলাফেরা ছাড়াও ব্যথা করলে দেরি না করে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন৷
৫. কাফ মাসল পেন হলে যে পায়ে ব্যথা হবে, তাতে ভর করে হাঁটতে অসুবিধা হবে৷ কাফ পেনের জায়গা ফুলে থাকবে৷


পায়ের গোড়ালি ব্যথায় করণীয়• কাফ মাসল পেন :
১. রক্ত জমাট বাঁধলে কাফ মাসল পেন হয়৷ রক্ত জমাট বেঁধে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়, যা থেকে পা ফুলে যায়, ব্যথা হয়৷ কখনও কখনও কোনও আঘাতজনিত কারণেও এই ধরনের ব্যথা হয়৷
২. লেগ ক্রাম্প থেকে কাফ পেন হয়৷

উপশম :
১. হিল পেনের ব্যথা থেকে বাঁচতে সব সময়ে নরম জুতো ব্যবহার করুন৷ সিলিকন হিল প্যাড দেওয়া জুতো ব্যবহার করলে সব চেয়ে ভাল হয়৷
২. উঁচু-নিচু জায়গায় বেশি হাঁটা চলবে না৷
৩. মাসল পেন থাকলে অবশ্যই ওজন নিয়ন্ত্রণ করা উচিত৷
৪. শরীরে ভিটামিনের অভাব থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত৷ কাফ মাসল পেন, গোড়ালিতে ব্যথা থাকলে ভিটামিন-ডি ও ভিটামিন-ই বেশি করে খেতে হবে৷ বেশি করে সবুজ শাক-সবজি, ফল খাওয়াও আবশ্যক৷ এছাড়া ব্যথা এড়াতে কর্ড লিভার অয়েল উপকারি৷ বেশি করে সামুদ্রিক মাছ খেলেও উপকার পাওয়া যায়৷
৫. বদ হজম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, বেশি করে জল খেতে হবে৷ তেল-ঝাল জাতীয় খাবার বেশি খাওয়া চলবে না৷ ডাবের পানি ও ফল বেশি করে খেতে হবে৷
৬. বেশি ব্যথা হলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত৷ ব্যথার পিছনে অন্য রোগ থাকলে সেই রোগ নির্মূল করা আগে প্রয়োজন৷

গোড়ালির ব্যথা কমাতে স্ট্রেচিং : 
শুধু ডাক্তারবাবুর পরামর্শ, ওষুধ, জুতো আর খাওয়া-দাওয়া ঠিক রাখলেই চলবে না। তার সঙ্গে কিছু এক্সারসাইজও প্রয়োজনীয়। কী ভাবে করবেন সেই এক্সারসাইজ, জেনে নিন ধাপে ধাপে।
১. চেয়ারে বসে যে পায়ে ব্যথা, সেই পায়ের গোড়ালির অংশ থেকে অন্য পায়ের থাইয়ের উপর ক্রস করে রাখুন৷
২. যে পায়ের গোড়ালিতে ব্যথা, সেই দিকের হাত দিয়ে ওই পায়ের পাতাটা টেনে ধরতে হবে হাঁটুর দিকে৷ তাতে পায়ে একটা চাপ বা স্ট্রেচ তৈরি হবে৷ তারপর অন্য দিকের হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে ব্যথা-ধরা পায়ের চেটোর মাঝখানে গোড়ালির দিক থেকে উপরের দিকে ঘষতে হবে৷ গোড়ালির হাড়ে শিরশিরে ব্যথা অনুভব হবে৷
৩. এইভাবে পা টেনে রেখে বুড়ো আঙুল দিয়ে চেটো ঘষতে ঘষতে ১০ গুনতে থাকুন৷ এরকম দিনে ১০ বার করতে হবে৷ সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে পা ফেলার আগে এই এক্সারসাইজ করলে তাড়াতাড়ি সুফল পাবেন৷

পায়ের গোড়ালি ব্যথায় করণীয়• সোলিয়াস স্ট্রেচ :
এক হাঁটু মুড়ে বসতে হবে৷ হাত দুটি পাশে মাটি স্পর্শ করে থাকবে৷ যে পায়ে কাফ মাসল পেন হচ্ছে, সেই পায়ের পাতা মাটিতে রেখে গোড়ালি উঁচু করে বসতে হবে, যাতে পিছনের অংশের চাপ ওই পায়ে পড়ে৷ ৩০ সেকেন্ড এভাবে থেকে আস্তে আস্তে পিছনের অংশ দিয়ে পায়ের উপর চাপ কমাতে হবে৷ এভাবে তিনবার এক্সারসাইজ করতে হবে। তবে হাঁটু ও কোমরে ব্যথা লাগলে জোর করে এই ব্যায়াম করা উচিত নয়৷


Post a Comment

Disqus