বাবার কোলে চড়ে একুশের সকালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আসে চট্টগ্রাম নগরীর ফুলকী স্কুলের শিক্ষার্থী পূর্ণ দত্ত (৫)।
বর্তমান বার্তা প্রতিনিধি/চট্রগ্রাম/বর্তমান বার্তা ডট কম / শনিবার সকালে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় পূর্ণ। ভিড়ে ঠেলে শহীদ বেদিতে পৌঁছাতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগে।
তবু পূর্ণ বা তার বাবা পুষ্পল দত্তের মুখের হাসি মলিন হয়নি। খুশি খুশি ভাব নিয়ে পূর্ণ আধো আধো বোলে বলে, “শহীদ মিনারে ফুল দিয়েছি। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি।”
এই শিশুটির মতো নগরীর নানা প্রান্ত খেকে শনিবার সকালে হাজার হাজার শিশু-কিশোর জড়ো হয় শহীদ মিনারে।
কেউ এসেছে বিদ্যালয়ের সহপাঠীদের সঙ্গে, কেউ বাবা-মায়ের হাত ধরে, আবার কেউ কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষে।
বেলা বাড়ার সাথে শহীদ মিনারে মানুষের স্রোত বাড়তে থাকে, সেই সঙ্গে ফুলে ফুলে ভরে উঠতে থাকে শহীদ বেদি।
পতাকা হাতে মিছিল করতে করতে এসেছেন কেউ। আবার কেউ এসেছেন খালি পায়ে মৌন মিছিল নিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে।
এর আগে শুক্রবার রাত ১২টা থেকে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানতে ঢল নামে সব শ্রেণির মানুষের। শুরুতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সরকারি কর্মকর্তারা শ্রদ্ধা জানানোর পর সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় শহীদ মিনার।
তবে এবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল জোরদার। নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয় শুক্রবার রাত থেকেই।
শহীদ মিনারের আশেপাশের এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তল্লাশি ছাড়া কাউকে শহীদ মিনার এলাকায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
শনিবার সকালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় সাংস্কৃতিক সংগঠন খেলাঘর, বোধন আবৃত্তি পরিষদ, প্রমা আবৃত্তি সংগঠন, নারী প্রগতি সংঘ ও চারণ।
শ্রদ্ধা নিবেদন করে সিপিবি, যুব ইউনিয়ন, ছাত্র ইউনিয়ন, দক্ষিণ জেলা বিএনপি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), জাসাস, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, প্রচেষ্টা বাংলাদেশ, গ্রিন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সামাজিক- রাজনৈতিক সংগঠন।
এর আগে শুক্রবার রাতে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান যথাক্রমে গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, সিটি মেয়র মনজুর আলম, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন।
এরপর ফুল দেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল্লাহ, জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম, নগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার এ কে এম শহীদুর রহমান ও জেলা পুলিশ সুপার এ কে এম হাফিজ আক্তার।
এরপর শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানায় মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, জাতীয় পার্টি, শ্রমিক লীগ, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি, রেলওয়ে শ্রমিক লীগ ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ড।
চবিতে একুশ
ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা।
সারাদেশে ২০ দলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধের মধ্যেও ভাষা শহীদদের স্মরণ করতে নগরী থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে চবি ক্যাম্পাসে সকালে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
ভোরের আলো ফুটতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়।
এরপর বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের স্মরণ করেন।
সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয় বুদ্ধিজীবী চত্বরে আয়োজিত আলোচনা সভায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেন শিক্ষকরা।
আলোচনা সভার শুরুতেই ভাষা শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করেন উপস্থিত শিক্ষক শিক্ষার্থীরা।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আনোয়ারুল আজিম আরিফ বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দেলন শুধু আমাদের মাতৃভাষার অধিকারই ফিরিয়ে আনেনি, জন্ম দিয়েছে স্বাধীনতার চেতনার।
তরুণ প্রজন্মের কাঁধেই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে বলে আলোচনা সভায় মন্তব্য করেন উপ-উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী।
Post a Comment
Facebook Disqus