বর্তমান বার্তা ডট কম /১৭ মার্চ ২০১৫/ ছোটবেলায় স্কুলে যাদু দেখাতে এসেছিল এক লোক। তন্ময় হয়ে যাদু দেখেছে মৌরি। কত লোকের ভিড়! রুদ্ধশ্বাস সবার। নয়না ওর পাশে বসেছিল আর বলছিল, সব মিথ্যে । ওর কোনো অলৌকিক ক্ষমতাই নেই।
ওর মামা বলেছে সব নাকি হাত সাফাইয়ের কাজ! এজন্যে যাদুকররা তাদের পেছনে কাউকে বসতে দেননা।
এসব কথা হাজারো শুনেও মৌরি বিশ্বাস করতে নারাজ।
একগাদা ছেড়া কাগজ খেয়ে নিয়ে একটু পরেই ফিতার মত জোড়া লাগানো অবস্থায় তা বের করে নেয়ার প্রক্রিয়াকে নয়না যতই মুথে লুকিয়ে রাখা কাগজ বলুকনা কেন মৌরি তা বিশ্বান করতে রাজী হয়নি।
সবার শেষে ছিল ইচ্ছেপূরণ পর্ব।
কেউ যদি ভালো উদ্দেশ্যে ম্যাজিসিয়ানের কাছে কিছু চায় তাহলে যাদুর বাক্স সেটা পূরণ করবে।
যাদুর বাক্সের কাছে যারাই চকলেট, লজেন্স চেয়েছে যাদুর বাক্স তা পূরণ করেছে। কিনÍু অনেকের ইচ্ছে পূরণ যাদুর বাক্স করেনি। কখনো বলেছে, এখন নয় তোমাকে পওে দেয়া হবে। কখনো বলেছে, তুমি ভালো মনে চাওনি তাই যাদুর বাক্স তোমাকে কিছু দিতে চায়না।
এ সময় নয়নার বুদ্ধিতে পেয়ারা চাইল মৌরি যাদুর বাক্সের কাছে।
যাদুকর ওর ঝোলা থেকে কচকচে একটা পেয়ারা বের করে মৌরির হাতে দিয়েছিল। মৌরির আনন্দ দেখে কে?
চটজলদি মৌরির ইচ্ছেপূরণ করায় নয়নাও বেশ অবাক হয়েছিল সেদিন।
সেদিন মৌরি অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল , বড় হলে সে একজন যাদুকরকে বিয়ে করবে। বর ওর সখ-আহ্লাদ সব মেটাতে পারবে।তার যে ম্যালা ক্ষমতা!
মৌরি কিছুই জানেনা। কার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে? সে দেখতে কেমন? কোথায় থাকে? কী করে? পরিবারে কে কে আছে? বয়স কত? আর্থিক অবস্থা কেমন? বড় ভাইয়ের সঙ্গে এসব আলাপ করার সাহস নেই তার। ভাবীর সঙ্গেও ওর সম্পর্ক এত ফর্মাল যে, দু’একটা কথাবার্তা ছাড়া তেমন কোনো আলোচনাই হয়না। ভাতিজা, ভাতিজি’র আচার আচরণ ওদের ‘আশ্রিত’ ভেবেই আবর্তিত । অতএব, ওদের সাহায্য নেয়ারও সুযোগ নেই।
এছাড়া মৌরির এমন কোন অবলম্বন নেই যে, বড় ভাইয়ের বিরদ্ধে সে দাঁড়াতে পারে। মৌরিকে হয় বিয়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে কিংবা এ বাড়ী থেকে পালাতে হবে। পালিয়ে গিয়ে সে কোথায় উঠবে? সেখানে যদি আরো অনিশ্চিত জীবনের দেখা মেলে? তখন ফিরে আসার পথও বন্ধ হয়ে যাবে।
এছাড়া এ বাড়িতে থেকে ছোট ভাইয়ের খোঁজ খবর নেয়ার সুযোগ পাবেনা সে! বাইরের পরিস্থিতিও অনুকূল না হতে পারে । তবে হতেওতো পারে! যেমন এ বাড়িতে বড় ভাইকে কব্জা করে ভাবী মহারানীর মতো দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানাচ্ছেন। বড় ভাইয়ের শালা-শালীদেরতো বটেই তাদের আন্ডা-বাচ্চাদের জন্ম দিনের অনুষ্ঠান হয় এ বাড়ীতে। হয়না শুধু আপন ভাই-বোনদের। তাদের কোনো সাধ-আহ্লাদ নেই যেন! ভাবীর বাড়ির লোকদের আচরণ দেখে মনে হয় বাড়িটা তাদের। মৌরি, তার ভাই ও মা এখানে আশ্রিত মাত্র। ভাবীর অবস্থানে নিজেকে বসিয়ে মৌরির ভালোই লাগলো। যদিও মৌরির বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো বড় ভাই তার জন্য কোনো বিত্তশালী পরিবার বাছাই করেছে। কারণ ভাবীর বোনের ‘বর’দের আর্থিক অবস্থার কাছাকাছি পরিবার হলেও এ বিয়েতে ভাবীর ছাড়পত্র অন্তত: মিলতোনা।
মৌরি ভবিষ্যতের উপর এ বিষয় ছেড়ে দেয়াই ভালো মনে করলো। ভাগ্য যেখানে নিয়ে যায় সেখানেই যেতে হবে । কারণ ¯্রষ্টা নিশ্চয়ই তা চান। আর তাছাড়া ‘ছোট্টু’ ভাইয়ের কোনো কাজে লাগা যায় কিনা তা-ও তাকে দেখতে হবে। সে ছাড়া ওকে দেখবে কে? ছোট্টু তাকে নিয়ে লড়াই করেছে। ছোট্টু -কে নিয়ে লড়াইটা মৌরিকেই করতে হবে।
মাহমুদ খানিকটা অন্যমনস্ক ছিল। রাজুর দোকান চোখে পড়তেই রিক্সাওয়ালার পিঠে হাত দিয়ে বললো, এ্যাই . . .ই . . .ডাইনে দিয়ে যাও, ডাইনে . . .!
রিক্সাওয়ালা এক লহমা ওর দিকে তাকিয়ে বললো, ছাপড়া মসজিদ যাইত্যাননা ?
ঃ না, ডাইনে যাও।
তিনটা আন্ডাবাচ্চা নিয়ে এক দম্পতি রিক্সায়। বাচ্চা সামাল দিয়ে রিক্সায় নিরাপদে বসে থাকতে গলদঘর্ম। মাহমুদ মজা পেলো। মানুষের এখন অনেক টাকা। কিন্তু ওযে একটা মাত্র মেয়েকে কীভাবে বড় করবে সে শংকায় রাত-দিন ভোগে।
বটতলার মোড়ে এসে রিক্সা- জটে পড়ে গেল ওর রিক্সা। মাহমুদের বসে থাকতে ইচ্ছে করছিলনা। সে ভাড়া গছিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। সামনেই মেস্ । এই মেস বাড়িতে পাক্কা বারোটা বছর কাটিয়েছে সে। ভালোই লাগে ওর আটপৌরে জীবন। এরুম সে রুমের বালাই নেই। ফার্নিচার, পর্দার ওপর জোর নেই। একজনের ভাঙা ড্রেসিং টেবিল আছে তাতেই ব্যস্ , নিঃশঙ্ক চিত্তে সবাই তা ব্যবহার করছে।
মাহমুদ-কে দেখে তারেক, মাসুদ, ইউনুস হৈ হৈ করে উঠলো। সঙ্গে থাকা ছোকড়া গোছের দু’জনও তাদের সাথে যোগ দিল।
বড় প্লাস্টিকের গামলায় মুড়ি, চানাচুর, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, সরষেতেল আর ধনে পাতা মাখানো হয়েছে। মুঠো মুঠো নিয়ে সবাই খাচ্ছে।
মাহমুদ অবাক হয়ে ঘড়ি দেখলো। এগারোটা বাজে।
তোমরা এখন নাস্তা করছো ?
তারেক গাল ভর্তি মুড়ি চিবোতে চিবোতে বললো "তাড়াড়াড়ি হাত লাগাও ! ভাটির টানতো ! জিরো ব্যালেন্স হতে সময় নেবেনা।’
অপরিচিত ছোকড়ারা তাগিদ দিল "খান, খান। বাসায় এসব পাবেননা ! আমরা স্বাধীন, সার্বভৌম। মোরা বন্ধনধীন, মুক্ত স্বাধীন . . . ! আমারও মাসে একবার যেতে হয় বাড়ীতে। কিন্তু এত নিয়ম, কানুন, অভাব, অভিযোগ, নিন্দা, কুৎসা, আফসোস, হতাশা, কর্তব্য, দায়িত্বের আলোচনা হয় যে দুই দিনেই হাঁপ উঠে যায়।’
মাহমুদ দু’দুটো মরিচের টুকরো চিবিয়ে খেতে গিয়ে ঝালে "আহ্ ’ করে মুখ খুলে মাথা নাড়তে থাকলো।
তারেক মৃদু হেসে বললো- লুটের শাস্তি ! কাল সন্ধ্যায় "ইভানিং লুট !’
মাহমুদ মুখ ব্যাদান করে বললো, "ঝালটা কমানো যায়না ?’
মাসুদ তীব্র মাথা নাড়ে।
"নো, নেভার, কাভি নেহী, নৈব চ: . . . .। ইভনিং লুটে থাকে আস্ত মরিচ দেয়া পেঁয়াজু বা ডাল বড়া। লুটের ভাগ পেয়ে হাসো, কিন্তু শাস্তি হিসেবে কাঁদবেনা তা কী করে হয় ? এটা লুটতরাজের "ইন বিল্ট, সিস্টেম !’
মাহমুদ খানিকটা তেতে উঠলো ওর কথায়। "এত ঝাল খেলে আলসার হবে। এরপর এ্যান্টাসিড- এর মালা পড়ে চলতে হবে . . . .।
তারেক গামছায় হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে আসে। সরি্য ব্রাদার, পরীক্ষা করেছি। কাঁচা মরিচে যে পরিমাণ "সি’ ভিটামিন আর সালফার থাকে আর এর ঝাল যেটুকু মুখের এক্সারসাইজ করায় সে অনুযায়ী "আলসার কালচার’ একেবারেই নেগলিজিবল।
মাহমুদ ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা বেজেছে দেখে ওঠার প্রস্তুতি নিল।
"দেরী হয়ে গেল। বাজার করতে হবে।’
মাসুদ পত্রিকার পাতা উলটাতে গিয়ে ওর দিকে তাকায়
"শুক্রবার ,– ছুটির দিন না ?’
"তোমার ভাবি মেয়েকে শিশু একাডেমিতে নিয়ে যাবে আড়াইটায় . . . .’
"তোমার মেয়েকে কোন স্কুলে ভর্তি করালে ?’
"ঐ লিটল লার্নার্স- এ ! আসি তাহলে দেখা হবে।’
তারেক যথারীতি হাসে।
যেতে যেতে টোটকা জোকস্ শুনে যাও!’
মাহমুদ একটু থমকে দাঁড়ায়।
পার্কের এক বেঞ্চে নবীন স্বামী- স্ত্রী ও অন্য বেঞ্চে প্রেমিক-প্রেমিকা ঘনিষ্টভাবে বসে আছে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে কীভাবে বুঝবে কোন জুটি স্বামী-স্ত্রী আর কোন জুটি প্রেমিক- প্রেমিকা ?
মাহমুদ বললো -পোশাক দেখে ?
তারেক মাথা নাড়ে।
ঃ লজ্জাবোধ দেখে ।
ঃ মানে ?’
ঃ ঘনিষ্টতা তুমি দেখে ফেলেছো ভেবে স্বামী-স্ত্রী লজ্জা পাবে। আর থোড়াই কেয়ারকরি ভাবের ঘনিষ্টতা অব্যাহত রাখার ধরন দেখে তুমি নিজেই লজ্জা পেলে বুঝতে হবে ওরা প্রেমিক-প্রেমিকা।
মাহমুদ হা-হা করে হাসে।
ঢাকা শহরের স্কুলগুলোতে ক্লাসরুমের পরিসর খানিকটা চেয়ার কোচের মতই। হাঁটাচলা করা যাবে মাগার দৌড় ঝাঁপের কোনো সুযোগ নেই। খোলা বারান্দা, মাঠ এগুলো ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। পাবলিক স্কুলে খেলাধুলার জায়গা কিছুটা হলেও আছে কিন্তু প্রাইভেট স্কুলে ওসবের বালাই নেই। গার্ড়িয়ানদের অবস্থাও তাই নাজুক। গানের কথার মতই এখানে-ওখানে-যেখানে-সেখানে ঘুরেই সময় কাটাতে হয।
বিকল্প পথটা সময় ও ব্যয় সাধ্য। রিক্সাভাড়া দিয়ে বাসায় ফেরা। সময় হলে ফের আসা। হাউজ ওয়াইফদের জন্যব্যাপারটা ‘ইকনমিক’ না । মৌরি তাই প্রস্তুতি নিয়ে আসে। সকাল ন’টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করেই সময় কাটাতে হয় ওকে। বিচিত্র ধরনের মহিলারা আসেন বাচ্চাদের সাথে। যদিও মায়ের সংখ্যা বেশি কিন্তু কাজের বুয়া থেকে শুরু করে পরিবারের বিভিন্ন সম্পর্কের নারীও আসে। কিছু কিছু পুরুষও আসে। তবে তারা মেয়েদের মত দল বেঁধে ঘোরেনা। তাদের দেখা মেলে স্কুল শুরু আর ছুটির সময়ে।
মা-বাবা, ভাই-বোনদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ এমনকি দেখা-সাক্ষাৎ, খাবার-উপহার লেনদেন, কেনাকাটা কত কিছুইনা হয় এ সময়ে।
রোগাটে চেহারার কাকলীকে গালগল্পে পাওয়া যায়না। একমনে বই পড়ে। কৌতুহলবশত মৌরি একদিন ঘন্টা দুয়েক ওর পাশে ছিল। কাকলী এক মনে বই পড়ে গেছে। ওর দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। পরে অধৈর্য হয়ে মৌরি নিজেই আলাপ করেছে ওর সাথে
ঃ আপনার কে পড়ে এখানে?
ঃ বোনের মেয়ে।
ঃ ও!
ঃ আপনি কী করেন ?
ঃ বই পড়ে.. (কাকলীর নিরানন্দ হাসি)
ঃ কী বই?
ঃ জেনারেল নলেজ।
ঃ বোনের মেয়েকে পড়ানোর জন্য বুঝি?
ঃ নাহ্ , নিজের জন্য।
ঃ বুঝলামনা।
কাকলীকিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বইয়ের এলোমেলো পাতা উল্টালো।
ঃ প্রাইমারী স্কুলের ‘টিচার’ পদে পরীক্ষা দিতে চাই।
ঃ ও তাই নাকি? আজ কী কী পড়লেন?
ঃ অনেক কিছু। আই, এ, পাশ করে যা না জেনেছি তা এই বই থেকে জানা যায়।
ঃ যেমন?
ঃ যেমন, বাংলাদেশের কোন জেলায় শিক্ষার হার বেশি?
ঃ কোন জেলায়? ঢাকা না ময়মনসিংহ?
ঃ বরগুনা জেলায়। বলেন দেখি, প্রথম কোন গ্রন্থে ‘বঙ্গ’ শব্দ পাওয়া যায়?
মৌরি মাথা নাড়ে। জানা নেই।
ঃ ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ গ্রন্থে ‘বঙ্গ’ শব্দের উলেখ আছে। এবার বলেনতো, মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন সেক্টরে কোনো সেক্টর কমান্ডার ছিলেননা?
মৌরি এবার হেসে ফেললো।
ঃ পারবেননা তো? মুক্তিযুদ্ধের ১০নং সেক্টর ছিল নৌ-বাহিনীর অধীনে। এ সেক্টরে কোনো সেক্টর কমান্ডার ছিলেননা।
ঃ ভালোইতো আপনি অনেক কিছুই জানেন। আড্ডার আসরতো আপনি একাই মাত্ করতে পারেন।
ঃ না। আমি ঠিকানাহীন মানুষ। আড্ডায় বসলে আমাকে অবজ্ঞা করবে। তাই আড্ডায় যাইনা।
ঃ ঠিকানাহীন মানুষ মানে?
ঃ আমাকে দেখে বুঝতে পারছেননা? এ বয়সে আমার কলেজ-ইউনিভার্সিটির ক্লাসে থাকার কথা। নিদেন পক্ষে কোনো চাকরি । কোনোটাই আমার ভাগ্যে নেই। ভাগ্য ফেরাতে ঢাকায় এসেছি। অলিখিত শর্ত মানতে হয়েছে। বাচ্চা স্কুলে আনা-নেয়া, পড়ানো, ঘরের কাজে হেল্প......
ঃ বলেন কী? অনেক কাজ..........
ঃ তাতেও খুশিনা। চান্স মতো ভগ্নীপতিও অনেক আবদার- ইশারা করতে চায়...........।হেসে, না বোঝার ভান করে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করি। সবসময় কি আত্মরক্ষা সম্ভব?
চলবে
Post a Comment
Facebook Disqus