গৌরব উজ্জল ইতিহাস ঐতিহ্য ধারন করা প্রাচীন পুরাকীর্তির পর্যটন নগরী সোনারগাঁ
আশরাফুল আলম/বর্তমান বার্তা ডট কম/ ৩  মার্চ ২০১৫/   নারাযনগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বিদ্যমান অসংখ্য পুরাকীর্তির মাঝে উল্ল্যেখ যোগ্য হল সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের মাজার , ঐতিহাসিক পাঁচপীরের মাজার ও মসজিদ, মোগড়া পাড়া দমদমায় দানেশমান্দ ইব্রাহিম ও মুন্নাশাহর সমাধি, দমদমা শাহী কবরখানা, গোয়ালদীতে আলাউদ্দিন হোসেন শাহী মসজিদ, সুলতান জালাল উদ্দিন ফাতে শাহের মসজিদ,দমদমা ও পানাম নগরীতে নীলকুঠি, টাকশাল বাড়ী, মহবত খানা,পানাম পঙ্খীরাজ খাল ও সেতু, ইউসুফগঞ্জের মসজিদ, হিন্দুদের তৈরি অসংখ্য অট্টালিকা, মঠ, মন্দির, ঠাকুর ঘর, গোসল খানা, নাচঘর, খাজাঞ্চি, দরবার কক্ষ, গুপ্তপথ, ভোজনালয়, বিচারালয়, প্রমোদালয় ইত্যাদি।

গিয়াস উদ্দিন আযম শাহর সমাধি ঃ মোগরাপাড়া দমদমা থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে শাচিলাপুর গ্রামের পাশে খালের পাড়ে কালো পাথরে নির্মিত যে মাজার তা সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহর মাজার নামে পরিচিত।খালের পাড়ে একই অবস্থানে ২টি পাঁকা কবর আছে,এর মধ্যে পশ্চিম পাশের সমাধিটি সম্পূর্ন কালো পাথরে তৈরি। জেমস ওয়াইজের মতে,এক সময় এটি ছিল বিশাল সৌধ,কিন্তু বর্তমানে সমাধিটি ধবংস প্রাপ্ত।সমাধিটি ১০ফুট লম্বা,সাড়ে ৫ফুট চওড়া ও ৩ ফুট উচু। এর উপরে আছে একখন্ড কালো পাথর যা অর্ধবৃত্তাকারে নির্মিত। মুল সমাধিটির কার্নিশের মধ্যে রয়েছে সূক্ষ অলংকরন কাজ। দুপাশে খুদিত রয়েছে তিনটি করে খাজ বিশিষ্ট খিলান,খাজের মধ্যে রয়েছে প্রলম্বিত শিকল ও ঝুলন্ত ঘন্টার নকশা। স্থানীদের কাছে এটি কালা পীরের মাজার বলে খ্যাত। অধ্যাপক দানী ,এই গিয়াস উদ্দিন আযম শাহর মাজারকে বাংলাদেশের প্রাচীনতম মুসলিম কীর্তি বলে উল্ল্যেখ করেছেন।

পাচঁ পীরের মাজার মসজিদ ঃ সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহর মাজারের প্রায় ৫০০গজ দুরে ভাগল পুর গ্রামে একটি মসজিদ দেখতে পাওয়া যায়। চুনসুড়কির গাঁথুনির এ মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এবং দেয়াল গুলো সাড়ে ৩ফুট চওড়া।স্থানীয় লোকদের মতে ৭০০বছর আগে এ মসজিদটি নির্মিত হয়। মোগল আমলে অথবা কোম্পানী আমলে মসজিদটি একবার সংস্কার করা হয়েছে বলে ধারনা করা হয়। এ মসজিদের পিছনে প্রত্যেক দিকে ৬০ফুট লম্বা অনুচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত বর্গাকারের উম্মুক্ত প্রাঙ্গনে একসাথে পাশাপাশি ৫টি কবর রয়েছে। সমাধিগুলি একই বৃত্তের ওপর একই মাপে নির্মিত এবং মাটি থেকে সাড়ে ৪ফুট করে উচু। সমাধি গুলির মাঝামাঝি স্থানে ইটের তৈরি একটি অতিক্ষুদ্র দোচালা ঘর আছে। এটিকে বাতি ঘর (চেরাগদানী ঘর )বলা হয়। স্থানীয় লোকজন মাজার গুলোকে পাঁচপীরের মাজার বলে জানে।সৈয়দ মোহাম্মদ তাইফুরের মতে,এক সময় মঘ জলদস্যুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রাক্কালে পাঁচ ভাই এক সাথে নিহত হলে ,তাদেরকে এখানে কবর দেওয়া হয বলে জনশ্রুতি আছে। নির্মিত সমাধি ও পাচীর বেষ্টিত অঙ্গনটি দেখে অনুমান করা যায় তারা বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তারা কে কি ছিলেন তা সঠিক ভাবে জানাযায়নি।স্থানীয় অনেকে ধারনা করেন,সুলতানি আমলে পাঁচপীরের মুজাহিদের কবর এখানে ছিল। পরে মোঘল আমলে কবর গুলো নতুন করে সংস্কার করা হয়। স্বরূপ চন্দ্র রায় তার সূবর্ণ গ্রামের ইতিহাস গ্রন্থে উল্ল্যেখ করেন। সোনারগাঁয়ে যে পাঁচপীর বা ফকিরের শ্রেণীবদ্ধ রূপে পাঁচটি মাজারের ভগ্নাবশেষ আজও বিদ্যমান আছে। তাহার উপরে লেখা আছে গয়েসদি,সামসদি,সিকান্দর,গাজী ও কালু। গয়েসদিÑবাদশাহ গয়েসউদ্দিন,সামসদিÑপূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গের স্বাধীন শাসনকর্তা সামসুদ্দিন। সিকান্দারÑবাংলার প্রসিদ্ধ বাদশাহ ,যাহার হাতে বাংলা জরিপ হয়েছিল। গাজীÑ ধর্মযুদ্ধে জয়ী হওয়া গাজী খাঁ, কালু Ñ হিন্দু ফকির ,গাজীর মন্ত্রনদাতা,অত্যন্ত প্রিয় সহচর।

দমদমা ঃ মোগরাপাড়ায় মসজিদ,কবরস্থান,নহবতখানা প্রভৃতি কীর্তির চারদিক ঘিরে একটি বিরাট এলাকা নিয়ে যে পরিখার চিন্য দেখা যায় এটিই হল দমদমা এলাকার অবস্থান। সোনারগাঁয়ের প্রাচীন পুরাকীর্তির বেশির ভাগই দমদমার অভ্যন্তরে অবস্থিত। সুলতান জালাল উদ্দিন ফতে শাহর মসজিদ,মুন্নাশাহ ও দানেশমান্দ ইব্রাহীমের মাজার, মসজিদ সংলগ্ন শাহী কবরস্থান,নহবত খানা,টাকশাল ,নাজির উদ্দিন মুন্সীর মাজার,অসংখ্য প্রাচীন ইমারতের অনেক নির্দশনই দমদমা এলাকার ভিতরে অবস্থিত। এই দমদমাকে স্থানীয়রা বার আউলিয়ার এলাকা বলে থাকে।

আলাউদ্দিন হোসেন শাহী মসজিদ ঃ উপজেলার গোয়ালদী গ্রামে প্রায় সাড়েশত বছরের ও বেশি সময়ের পুরানো একটি মসজিদ পরিলক্ষিত হয়। গোয়ালদী হোসেন শাহী মসজিদ নামে পরিচিত এ মসজিদটি আলাউদ্দিন হোসেন শাহর রাজত্বকালে মোল্লা হায়বর খান  ১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দে নির্মান করেন । মসজিদের ভিতরের উপরের অংশে রয়েছে চারটি করে ১২টি আয়তাকার কাঠামো পোড়া মাটির নির্মিত ফলক। এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির চারদিকে ফুল পাতা এবং মাঝে ঝুলন্ত নকশা রয়েছে। নির্মানের শুরু থেকে এই মসজিদটিতে ১৮৫২ সাল পর্যন্ত নিয়মিত নামাজ আদায় করা হত।এখন আর নামাজ আদায় হয়না।মোগল আমলে নির্মিত আরো একটি মসজিদ আছে যা সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে শাহ আব্দুল হামিদ নামক এক ব্যক্তি ১৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট আরো একটি মসজিদ নির্মান করেন। এটি যে মোগল আমলে তৈরি মসজিদ তা সহজে চেনার উপায় নেই।

প্রতœতত্ব অধিদপ্তর ও পানাম নগরী ঃ বাংলার প্রাচীন রাজধানী খ্যাত সোনারগাঁয়ের গৌরব উজ্জল ইতিহাস ঐতিহ্য শতশত বছর আগের । বিক্রম পুরের বৌদ্ধ রাজাদের হাতেই সোনারগাঁয়ের শাসন ভার ন্যাস্ত ছিল। মুসলিম বিজয়ের প্রায় এক শতাব্দী আগে বিভিন্ন বৌদ্ধ বংশ তথা চন্দ্রবংশ, পালবংশ সোনারগাঁয়ের কর্তৃত্ব করতেন। ঈশাখাঁ মসনদ-ই-আলার রাজধানী ছিল সোনারগাঁও। ঈশাখার পর সোনারগাঁও মোগলদের অধিকারে আসে এবং সোনারগাঁয়ের পরিবর্তে ঢাকা বাংলার রাজধানী হিসেবে গড়ে উঠে। মোগল ও ইংরেজ আমলে বহু সংখ্যক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার সোনারগাঁও ত্যাগ করে অন্যস্থানে চলে য়ায়। ফলে ধীরে ধীরে শ্রী-হীন হয়ে পড়ে সোনারগাঁও। ইংরেজ আমলে সোনারগাঁয়ের  হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা ধনে মানে বিশেষ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেন। তাদের ঐ সময়ের তৈরি অসংখ্য ইমারতের অস্তিত্ব বিশেষ করে পানাম নগরীতে আজও দেখা যায়। প্রাচীন কালে ইটের তৈরি দুতলা,তিনতলা বিশিষ্ট ইমারত গুলি দুটি লাইনে সাড়ি বদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে থাকা ভবন গুলি সোনারগাঁয়ের প্রানকেন্দ্র ছিল। আজও পানাম নগরীতে পরিলক্ষিত হয় অসংখ্য প্রাচীন ইমারত রাজি। সোনারগাঁয়ে আরো গড়ে উঠেছিল চারশত বছরের পুরানো মঠবাড়ি,পোদ্দার বাড়ি,ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নীলকুঠী,কাশিনাথের বাড়ি সহ নানা প্রাচীন ভবন। তবে অধিকাংশ ভবনই  এখন জীর্নদশা ও ভগ্নাবশেষ অবস্থায় দাড়িয়ে আছে। পানামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পঙ্খীরাজ খাল। সোনারগাঁ একটি অতি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক জনপদ। এর প্রাচীন নাম সূবর্ণ গ্রাম। মোগল আমলে বার ভূইয়াদের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী ঈশাখার রাজধানী ছিল সোনারগাঁ। সোনারগাঁও থেকে রাজধানী স্থানান্তর হলেও আজও সোনারগাঁয়ের সর্বত্র পরিলক্ষিত হয় ইংরেজ আমলের তৈরি অসংখ্য ইমারত ও ইতিহাস ঐতিহ্য ধারন করে আছে সূবর্ণ গ্রাম সোনার গাঁও।


Post a Comment

Disqus