৩ গ্রামে আর্সেনিকে আক্রান্ত প্রায় ৫শতাধিক মানুষ



স্টাফরিপোটার/বর্তমানবার্তাডটকম/   মার্চ ২০১৫/চুয়াডাঙ্গার বেগমপুরে আর্সেনিক সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। ওই এলাকার তিন গ্রামের পাঁচ শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছে আর্সেনিকের ভয়াবহ ছোবলে। আর্সেনিকে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ছয় গ্রামবাসীর। আক্রান্ত অন্যদের অনেকেই মৃত্যুপথযাত্রী। বলা হয় আর্সেনিকের কবলে ওই জনপদে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। মহামারী আকার ধারণ করার পরও আর্সেনিক দুষণে বা নিরসনে এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কোনো উপায় না থাকায় নিরুপায় হয়ে জেনে শুনেই প্রতিনিয়ত আর্সেনিক বিষযুক্ত পনি পান করতে হচ্ছে ওই গ্রামের অসংখ্য মানুষকে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের ডিহিকৃষ্ণপুর, গাবতলাপাড়া, মল্লিকপাড়া ও ডাক্তারপাড়ার গ্রামের অধিকাংশ মানুষই আর্সেনিকের কবলে। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই এক বা একাধিক মানুষ এ আর্সেনিক রোগে আক্রান্ত। ইতিমধ্যে আর্সেনিকোসিস বা আর্সেনিক রোগে আক্রান্ত হয়ে গ্রামের ফজিলা খাতুন, নছুরা বেগম, হাফিজুল ইসলাম, হায়দার আলী ও লিয়াকত আলী মারা গেছে। কোনো কোনো পরিবারের আবার একাধিক সদস্য এ রোগে আক্রান্ত হয়ে দূর্বিষহ জীবনযাপন করছে।
স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ২০০৭ সালের দিকে রোগ প্রতিরোধে আর্সেনিকযুক্ত নলকুপের পানির পরিবর্তে বিশুদ্ধ পানি পানের পরামর্শ দেন এবং নামকাওয়াস্তে কয়েকটি নলকুপ স্থাপন করে। যা বর্তমানে প্রায় সবগুলোই বিকল হয়ে পড়ে আছে অথবা ব্যক্তি মালিকানায় দখলে চলে গেছে। ফলে সামর্থের অভাবে প্রাণঘাতি জীবাণুযুক্ত পানিই পান করছেন ওই গ্রামের অধিকাংশ হত দরিদ্র মানুষ। তাই দিনকে দিন রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
ভূক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ওই গ্রামের মানুষ এ সমস্যায় ভুগলেও কেবল বিশুদ্ধ পানি পানের পরামর্শ দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কার্যক্রম।
সরেজমিনে আক্রান্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ইউনিয়নের ডিহিকৃষ্ণপুর গ্রাম, গাবতলিপাড়া, মল্লিকপাড়া ও ডাক্তারপাড়ার এ গ্রামগুলোতে বসবাস করে প্রায় ১৫শ পরিবার। তবে আশপাশের গ্রামের মানুষের কাছে গ্রামটি আর্সেনিক গ্রাম বলে পরিচিত। এ নামকরনের কারণ হিসেবে যা জানা যায় তা রীতিমত ভয়ংকর ও গা শিউরে উঠার মত।
মল্লিক পাড়ার বাসিন্দা রোজিনা খাতুন জানান, এখন আমাদের ছেলে বিয়ে দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। ছেলে মেয়ের বিয়ের কথা উঠলে গ্রামের নাম শুনলেই আর আমাদের ছেলে মেয়ের সাথে কেউ বিয়ে দিতে রাজি হয়না।
আমেনা খাতুন, আমজেদ হোসেন, মাছেদুল, নিয়ামত আলী জানান, স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ৭ বছর আগে ৪০/৪৫ ফুটের মত রিংসব বসিয়ে দিয়ে ছিলো কয়েক জায়গায় পানি না ওঠার কারনে সে গুলো প্রায় সবই নষ্ট হয়ে গেছে। যে পরিমান বসানোর কথাছিলো সে পরিমান না বসিয়ে অনেকটাই দায়সারা গোছের কাজ করে চলে গেছে। এতে করে সেখানকার মানুষ দিনের পর দিন জীবাণুযুক্ত প্রাণঘাতী পানি বাধ্য হয়ে পান করার ফলে আর্সেনিক আক্রান্ত দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে। আক্রান্তদের পাশাপাশি এলাকার জন প্রতিনিধিরা অবিল¤ে॥^ এলাকায় বিশুদ্ধ পানির প্ল্যান্ট স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। আর্সেনিক আক্রান্ত নিয়ামত আলী জানান, এ রোগের পিছনে হাটতে হাটতে অনেকেরই সংসার নষ্ট হয়ে গেছে। যে যা বলেছে সেখানে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছি। কোন ফলই হয়নি। বছর পাঁচেক আগে হিড বাংদেশ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এন্টিঅক্সিডেন্ট ভিটামিন ট্যাবলেট দিয়ে গিয়েছিলো। খেয়েছি ফলাফল শূন্য। কোন কাজেই আসেনি। আর্সেনিক আক্রান্ত ব্যাক্তিদের শাররীক কী কী সমস্যা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, শরীর সবসময় দূর্বল লাগে, ক্ষুধা লাগেনা, খাবারে অরুচি, ঠিকমত ঘুম হয় না, শ্বাস প্রশ্বাসে কষ্ট হয়। সারা শরীরে ব্যথা অনুভব হয়। এক কথায় আর্সেনিক আক্রান্ত মানে যন্ত্রনা নিয়ে বেঁচে থাকা। আর্সেনিক আক্রান্ত আমেনা বেগম(৬০) বলেন, জন্ম থেকেই এখানকার পানি পান করছি ৫ বছর ধরে আর চলা ফেরা করতে পারছি না। উঠে দাড়াতে পর্যন্ত পারছি না। একটি লাঠি আমার একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেগমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শামসুল হক এ বিষয়ে জানান, গ্রামগুলোর প্রায় ৫ শতাধিক মানুষ আর্সেনিকোসিস রোগে ভূগছেন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ পানি পরীক্ষাকরে করে গ্রামের অধিকাংশ নলকুপে আর্সেনিক পেয়েছে। আর্সেনিকমুক্ত টিউবয়েলগুলো বসানোর পরে সবগুলো অকেজ হলেও সারর কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নলকূপগুলো অল্পগভীর করায় সে গুলো মানুষের কোন কাজেই লাগেনি। ফলে দিনদিন এ রোগে আরও বেশি লোক আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব নলকুপ নির্দিষ্ট পরিমান পাইপ দিয়ে পুণঃস্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় গ্রামের দরিদ্র মানুষের কাছে তা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অপরদিকে আর্সেনিকের হাত থেকে বাঁচার জন্য গাবতলাপাড়ার বাবর আলীর বাড়িতে একটি মাত্র টিউবয়েল আছে। যেখান থেকে গ্রামের লোকজন শুধুমাত্র খাবারের পানি নেওয়ার জন্য লাইন দিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। এক কলসি পানি নেওয়ার পর কিছুসময় অপেক্ষা করতে হয় পিলটারে পানি জমলে তারপরে অপর জনকে নিতে হয়।
বেসরকারি এনজিও রিসোর পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কমকে জানান, আর্সেনিক আক্রান্ত এলাকায় আমরা কাজ করছি। বর্তমানে নিরাপদ পানি সরবরাহের জন্য কাজ করছে ইউরোপিয় ইউনিয়ন ও এনজিও ফোরাম। তারা পাইপ লাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহের কাজ করছেন।
এ ব্যাপারে দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু হাসানুজ্জামান নূপুর বলেন, আমরা রোগ সনাক্তের পর থেকেই চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যহত রেখেছি। নুতন করে কেউ আর্সেনিকে আক্রান্ত হচ্ছে কিনা তা প্রতিমাসেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। বর্তমানে এ রোগটি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নেই কমবেশি ছড়িয়ে পড়েছে।
দামুড়হুদা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ জানান, আমরা আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় নানাভাবে আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করে আসছি। তবে প্রয়োজনের তুলনায় নিজেদের সীমাবদ্ধতা কথাও স্বীকার করেন এই কর্মকর্তা।

Post a Comment

Disqus