বর্তমান বার্তা ডট কম / ২৮ জুন ২০১৫ / রোববার রাত আড়াইটা। রড বোঝাই একটি ট্রাক পাটুরিয়া ফেরিঘাটে এসে থামল। ঢাকা মেট্রো ট-১৬-৮৫২৯ নম্বরের ওই ট্রাকটি আসামাত্রই ঘিরে ধরলেন দু’তিনজন ব্যক্তি। লাঠি ও টর্চ হাতে ওই ব্যক্তিরা ট্রাকটির চালকের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন। এরপর ট্রাকটির চালক আরোজ মণ্ডলকে নিয়ে তাদের একজন ছুটলেন ঘাটের দুই নম্বর কাউন্টারে। কিছুক্ষণ পর ২ হাজার ১৪০ টাকা দিয়ে ফিরে এলেন ট্রাকটির চালক। অথচ ১২শ’ টন রড বোঝাই ওই ট্রাকটির জন্য সিরিয়াল ও ফেরি ভাড়া বাদ দেয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৬০ টাকা। বেশি টাকা কেন দিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাকটির চালক আরোজ মণ্ডল বর্তমান বার্তা ডট কমকে জানালেন, ‘ভাই বেশি টাকা না দিয়ে কোনো উপায় নেই। ওদের চাহিদামতো টাকা না দিলে এক সপ্তাহেও সিরিয়াল পাব না।’ আর এ রকম অভিযোগ শুধু আরোজ মণ্ডলের নয়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চলাচলরত প্রতিটি পণ্যবাহী ট্রাক থেকে এভাবেই প্রতিদিন অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। যাকে সোজা কথায় বলা হয় চাঁদা নিতে চাঁদাবাজি। রোববার রাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে অসংখ্য পণ্যবাহী ট্রাকচালকের সঙ্গে কথা বলে প্রকাশ্য চাঁদাবাজির নানা তথ্য পাওয়া গেছে।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাথুলী এলাকায় স্থাপিত অতিরিক্ত ওজনের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনের (ওজন সেতু) বিরুদ্ধেও চালকদের অভিযোগের অন্ত নেই। ভুক্তভোগী ট্রাকচালকদের অভিযোগ, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ওজন (২০ টন) নিয়ে পণ্য বহন করলেও কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাকপ্রতি এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনে তাদের প্রতিবার ৫শ’ থেকে দুই হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। আর পণ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত এ চাঁদার মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা চাঁদার অতিরিক্ত টাকা পণ্য বিক্রির সময় সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই তুলে নিচ্ছেন।
ট্রাকচালকদের অনেকে যুগান্তরকে বলেন, টাকা না দিলে ট্রাকচালকদের মামলাসহ নানাভাবে হয়রানি করা হয়। প্রতিবাদ করলে স্টেশনে দায়িত্বে থাকা লোকজন তাদের মারধরও করেন। পরিবহন শ্রমিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসনের লোক সব জানে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয় না। উল্টো চাঁদাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে নিয়মিত সুবিধা নেয়। তাই ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বাথুলিয়া এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন ও পাটুরিয়া ফেরিঘাট এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যশোর ট-১১-১৬২১ নম্বর ট্রাকের চালক সুজন বর্তমান বার্তা ডট কমকে জানান, পুরান ঢাকা থেকে রড নিয়ে তিনি ফরিদপুর যাচ্ছেন। রোববার রাত ৮টার দিকে ১২শ’ টন রড লোড করার পর ফরিদপুরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর প্রথমে বাবুবাজার ব্রিজের অদূরে ট্রাফিক সার্জেন্টের কবলে পড়েন। ওই সার্জেন্টকে তিনি ৩শ’ টাকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। দ্বিতীয় দফায় গাবতলী বাস টার্মিনালের অদূরে ট্রাফিক পুলিশকে ২শ’ এবং সাভারে পুলিশকে দিয়েছেন ২শ’ টাকা। এরপর ধামরাইয়ের বাথুলী এলাকায় এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনে দিয়েছেন আরও ১ হাজার টাকা। কেন তিনি এভাবে টাকা দিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাকচালক সুজন বর্তমান বার্তা ডট কমকে জানান, টাকা না দিলে লোড কন্ট্রোল স্টেশনে থাকা পুলিশের লোক কাগজপত্র পরীক্ষার নামে নানাভাবে হয়রানি করে এবং প্রতিবাদ করলে মামলা ঠুকে দেয়। অনেক সময় তারা গায়ে হাত তোলে। সুজনের দেয়া হিসাব মতে ঢাকা থেকে আরিচা পর্যন্ত পৌঁছতে পুলিশকে ৭শ’ এবং পাটুরিয়া ফেরিঘাটে সিরিয়াল ও ভাড়া বাবদ তাকে ১ হাজার ৮০ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ঢাকা থেকে আরিচা পর্যন্ত তার অতিরিক্ত খরচ ২ হাজার ৭৮০ টাকা।
রোববার রাত ১টার দিকে ধামরাই এলাকার বাথুলী বাসস্ট্যান্ডের অদূরে এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনে সরেজমিন প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থানকালে দেখা যায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দু’পাশে লাইট হাতে কয়েকজন লোক পণ্যবাহী ট্রাককে মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী ছোট লেনে যাওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছেন। ওই লেনেই ওজন পরিমাপের জন্য কয়েক বছর আগে বিশেষ যন্ত্র স্থাপন করে সরকার। মহাসড়কে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন ঠেকাতে এ লোড কন্ট্রোল স্টেশনটি স্থাপন করা হলেও এটি এখন ট্রাক চালকদের জন্য চরম বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে।
প্রায় এক ঘণ্টা ওই লোড কন্ট্রোল স্টেশনে অবস্থানকালে ঢাকা মেট্রো ট-১৮-৭১০০ নম্বরের ট্রাকচালকের কাছ থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা, ঢাকা মেট্রো ট-১৮-২৯২২ নম্বরের ট্রাক থেকে ১ হাজার টাকা, ঢাকা মেট্রো ট-১৬-০১৫৫ থেকে ১ হাজার ৮শ’ টাকা, ঢাকা মেট্রো-১৬-২২৪৩ থেকে ২ হাজার টাকা, চুয়াডাঙ্গা-ই-১১-০১৫৬ নম্বরের ট্রাক থেকে ১ হাজার ৫শ’ টাকা চাঁদা নিতে দেখা যায়। চাঁদা দেয়ার পর পাটুরিয়া ফেরিঘাটে এসে সিরিয়ালে থাকা এসব ট্রাকের চালকরা এভাবে চাঁদা দেয়ার কথা বর্তমান বার্তার কাছে স্বীকার করেন।
ক্ষুব্ধ কণ্ঠে ঢাকা মেট্রো ট-১৬ ২২৪৩ নম্বর ট্রাকের চালক ইউনুস বলেন, ‘আমাদের যদি ক্ষমতা থাকত তাহলে ওই গুলারে ট্রাকের চাকার তলে দিয়া মারতাম।’ তিনি বলেন, একজন মালিক এত টাকা দিয়ে ট্রাক কেনে। আর প্রায় দেড় লাখ টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন ছাড়াও প্রতি বছর ফিটনেসসহ অন্যান্য ফি বাবদ সরকারের ঘরে ৫০ হাজার টাকার ওপরে দিতে হয়। এরপরও এসব শয়তানরা নানা অজুহাতে আমাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।’
যশোর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেট্রো ট ১৬-০২৬৭ ট্রাকের চালক সিরাজ মিয়া বলেন, তিনি প্রায়ই এ সড়ক দিয়ে মালামাল নিয়ে যাতায়াত করেন। ওজন ঠিক থাকলেও তাকে এক হাজার টাকা দিতে হয়। এছাড়া অতিরিক্ত ওজন না থাকলেও টাকা না দিলে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
যশোরের কালীগঞ্জ থেকে আম নিয়ে ঢাকা যাচ্ছিলেন ঢাকা মেট্রো ড-১৪-৩০৫৪ নম্বরের ট্রাকচালক মজনু মিয়া। তিনি অভিযোগ করেন, ফেরিঘাটে মিনি ট্রাকের জন্য নির্ধারিত ৭৪০ টাকা ভাড়ার পরিবর্তে তিনি দিয়েছেন ১ হাজার ৪শ’ টাকা। এছাড়া কালীগঞ্জ থেকে ঢাকা পৌঁছতে তাকে লোড কন্ট্রোল স্টেশন (ওজন সেতু) ও পুলিশকে আরও ২ হাজার ৩শ’ টাকা গুনতে হবে। সূত্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আরিচা ফেরিঘাটে চাঁদাবাজির ধরনটাই ভিন্ন। এখানে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন, পুলিশ ও ঘাট কর্তৃপক্ষ মিলেমিশে চাঁদাবাজি করে। তাদের নিয়োজিত লাইনম্যানরা এ চাঁদার টাকা তোলেন। আর প্রতিদিন চাঁদার এ টাকা চলে যায় সংশ্লিষ্টদের পকেটে।
মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের স্থায়িত্ব রক্ষায় অতিরিক্ত পণ্য বহন ঠেকাতে ২০০৯ সালে কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাথুলী এলাকায় বসানো হয় ওজন নির্ধারক সেতুটি। নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ওজনের বেশি হলে অতিরিক্ত পণ্যবাহী যানবাহন উল্টোপথে ফেরত যাবে, না হলে মালামাল কমিয়ে ওজন সেতু পার হয়ে যেতে পারবে। ওজন সেতু রক্ষণাবেক্ষণ এবং ওভারলোড নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়োগ করা হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রেগনাম রিসোর্স লিমিটেডকে। কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে চালু অবস্থায় ওভারলোড নিয়ন্ত্রণের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগে বন্ধ রাখা হয় ওজন নির্ধারক সেতুটি। টানা ২২ মাস বন্ধ থাকার পর গত বছরের জানুয়ারিতে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সর্বোচ্চ ২০ টন নির্ধারণ করে ওজন সেতুটির পুনরায় উদ্বোধন করেন। বর্তমানে এ লোড কন্ট্রোল স্টেশনটি সড়ক ও জনপথ অধিদফতর পরিচালনা করছে।
চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে লোড কন্ট্রোল স্টেশনের ম্যানেজার মিজানুর রহমান বলেন, এখানে কোনো চাঁদাবাজি হয় না। কম্পিউটারের মাধ্যমে গাড়ির ওজন মাপা হয়। সরকার নির্ধারিত ২০ টনের বেশি হলেই তারা গাড়ি ফিরিয়ে দেন। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোড কন্ট্রোল সেন্টারে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিয়ে থাকে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশন আরিচা এরিয়া অফিসের অতিরিক্ত জেনারেল ম্যানেজার শেখ মো. নাসিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি ক্ষুদেবার্তায় তার সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাথুলী এলাকায় স্থাপিত অতিরিক্ত ওজনের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনের (ওজন সেতু) বিরুদ্ধেও চালকদের অভিযোগের অন্ত নেই। ভুক্তভোগী ট্রাকচালকদের অভিযোগ, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ওজন (২০ টন) নিয়ে পণ্য বহন করলেও কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাকপ্রতি এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনে তাদের প্রতিবার ৫শ’ থেকে দুই হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। আর পণ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত এ চাঁদার মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা চাঁদার অতিরিক্ত টাকা পণ্য বিক্রির সময় সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই তুলে নিচ্ছেন।
ট্রাকচালকদের অনেকে যুগান্তরকে বলেন, টাকা না দিলে ট্রাকচালকদের মামলাসহ নানাভাবে হয়রানি করা হয়। প্রতিবাদ করলে স্টেশনে দায়িত্বে থাকা লোকজন তাদের মারধরও করেন। পরিবহন শ্রমিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসনের লোক সব জানে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয় না। উল্টো চাঁদাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে নিয়মিত সুবিধা নেয়। তাই ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বাথুলিয়া এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন ও পাটুরিয়া ফেরিঘাট এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাটুরিয়া ফেরিঘাটে যশোর ট-১১-১৬২১ নম্বর ট্রাকের চালক সুজন বর্তমান বার্তা ডট কমকে জানান, পুরান ঢাকা থেকে রড নিয়ে তিনি ফরিদপুর যাচ্ছেন। রোববার রাত ৮টার দিকে ১২শ’ টন রড লোড করার পর ফরিদপুরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর প্রথমে বাবুবাজার ব্রিজের অদূরে ট্রাফিক সার্জেন্টের কবলে পড়েন। ওই সার্জেন্টকে তিনি ৩শ’ টাকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। দ্বিতীয় দফায় গাবতলী বাস টার্মিনালের অদূরে ট্রাফিক পুলিশকে ২শ’ এবং সাভারে পুলিশকে দিয়েছেন ২শ’ টাকা। এরপর ধামরাইয়ের বাথুলী এলাকায় এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনে দিয়েছেন আরও ১ হাজার টাকা। কেন তিনি এভাবে টাকা দিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাকচালক সুজন বর্তমান বার্তা ডট কমকে জানান, টাকা না দিলে লোড কন্ট্রোল স্টেশনে থাকা পুলিশের লোক কাগজপত্র পরীক্ষার নামে নানাভাবে হয়রানি করে এবং প্রতিবাদ করলে মামলা ঠুকে দেয়। অনেক সময় তারা গায়ে হাত তোলে। সুজনের দেয়া হিসাব মতে ঢাকা থেকে আরিচা পর্যন্ত পৌঁছতে পুলিশকে ৭শ’ এবং পাটুরিয়া ফেরিঘাটে সিরিয়াল ও ভাড়া বাবদ তাকে ১ হাজার ৮০ টাকা অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ঢাকা থেকে আরিচা পর্যন্ত তার অতিরিক্ত খরচ ২ হাজার ৭৮০ টাকা।
রোববার রাত ১টার দিকে ধামরাই এলাকার বাথুলী বাসস্ট্যান্ডের অদূরে এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনে সরেজমিন প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থানকালে দেখা যায়, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দু’পাশে লাইট হাতে কয়েকজন লোক পণ্যবাহী ট্রাককে মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী ছোট লেনে যাওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছেন। ওই লেনেই ওজন পরিমাপের জন্য কয়েক বছর আগে বিশেষ যন্ত্র স্থাপন করে সরকার। মহাসড়কে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন ঠেকাতে এ লোড কন্ট্রোল স্টেশনটি স্থাপন করা হলেও এটি এখন ট্রাক চালকদের জন্য চরম বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে।
প্রায় এক ঘণ্টা ওই লোড কন্ট্রোল স্টেশনে অবস্থানকালে ঢাকা মেট্রো ট-১৮-৭১০০ নম্বরের ট্রাকচালকের কাছ থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা, ঢাকা মেট্রো ট-১৮-২৯২২ নম্বরের ট্রাক থেকে ১ হাজার টাকা, ঢাকা মেট্রো ট-১৬-০১৫৫ থেকে ১ হাজার ৮শ’ টাকা, ঢাকা মেট্রো-১৬-২২৪৩ থেকে ২ হাজার টাকা, চুয়াডাঙ্গা-ই-১১-০১৫৬ নম্বরের ট্রাক থেকে ১ হাজার ৫শ’ টাকা চাঁদা নিতে দেখা যায়। চাঁদা দেয়ার পর পাটুরিয়া ফেরিঘাটে এসে সিরিয়ালে থাকা এসব ট্রাকের চালকরা এভাবে চাঁদা দেয়ার কথা বর্তমান বার্তার কাছে স্বীকার করেন।
ক্ষুব্ধ কণ্ঠে ঢাকা মেট্রো ট-১৬ ২২৪৩ নম্বর ট্রাকের চালক ইউনুস বলেন, ‘আমাদের যদি ক্ষমতা থাকত তাহলে ওই গুলারে ট্রাকের চাকার তলে দিয়া মারতাম।’ তিনি বলেন, একজন মালিক এত টাকা দিয়ে ট্রাক কেনে। আর প্রায় দেড় লাখ টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন ছাড়াও প্রতি বছর ফিটনেসসহ অন্যান্য ফি বাবদ সরকারের ঘরে ৫০ হাজার টাকার ওপরে দিতে হয়। এরপরও এসব শয়তানরা নানা অজুহাতে আমাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।’
যশোর থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেট্রো ট ১৬-০২৬৭ ট্রাকের চালক সিরাজ মিয়া বলেন, তিনি প্রায়ই এ সড়ক দিয়ে মালামাল নিয়ে যাতায়াত করেন। ওজন ঠিক থাকলেও তাকে এক হাজার টাকা দিতে হয়। এছাড়া অতিরিক্ত ওজন না থাকলেও টাকা না দিলে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
যশোরের কালীগঞ্জ থেকে আম নিয়ে ঢাকা যাচ্ছিলেন ঢাকা মেট্রো ড-১৪-৩০৫৪ নম্বরের ট্রাকচালক মজনু মিয়া। তিনি অভিযোগ করেন, ফেরিঘাটে মিনি ট্রাকের জন্য নির্ধারিত ৭৪০ টাকা ভাড়ার পরিবর্তে তিনি দিয়েছেন ১ হাজার ৪শ’ টাকা। এছাড়া কালীগঞ্জ থেকে ঢাকা পৌঁছতে তাকে লোড কন্ট্রোল স্টেশন (ওজন সেতু) ও পুলিশকে আরও ২ হাজার ৩শ’ টাকা গুনতে হবে। সূত্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আরিচা ফেরিঘাটে চাঁদাবাজির ধরনটাই ভিন্ন। এখানে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন, পুলিশ ও ঘাট কর্তৃপক্ষ মিলেমিশে চাঁদাবাজি করে। তাদের নিয়োজিত লাইনম্যানরা এ চাঁদার টাকা তোলেন। আর প্রতিদিন চাঁদার এ টাকা চলে যায় সংশ্লিষ্টদের পকেটে।
মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের স্থায়িত্ব রক্ষায় অতিরিক্ত পণ্য বহন ঠেকাতে ২০০৯ সালে কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বাথুলী এলাকায় বসানো হয় ওজন নির্ধারক সেতুটি। নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ওজনের বেশি হলে অতিরিক্ত পণ্যবাহী যানবাহন উল্টোপথে ফেরত যাবে, না হলে মালামাল কমিয়ে ওজন সেতু পার হয়ে যেতে পারবে। ওজন সেতু রক্ষণাবেক্ষণ এবং ওভারলোড নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়োগ করা হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রেগনাম রিসোর্স লিমিটেডকে। কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে চালু অবস্থায় ওভারলোড নিয়ন্ত্রণের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগে বন্ধ রাখা হয় ওজন নির্ধারক সেতুটি। টানা ২২ মাস বন্ধ থাকার পর গত বছরের জানুয়ারিতে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সর্বোচ্চ ২০ টন নির্ধারণ করে ওজন সেতুটির পুনরায় উদ্বোধন করেন। বর্তমানে এ লোড কন্ট্রোল স্টেশনটি সড়ক ও জনপথ অধিদফতর পরিচালনা করছে।
চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে লোড কন্ট্রোল স্টেশনের ম্যানেজার মিজানুর রহমান বলেন, এখানে কোনো চাঁদাবাজি হয় না। কম্পিউটারের মাধ্যমে গাড়ির ওজন মাপা হয়। সরকার নির্ধারিত ২০ টনের বেশি হলেই তারা গাড়ি ফিরিয়ে দেন। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোড কন্ট্রোল সেন্টারে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিয়ে থাকে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশন আরিচা এরিয়া অফিসের অতিরিক্ত জেনারেল ম্যানেজার শেখ মো. নাসিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি ক্ষুদেবার্তায় তার সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

Post a Comment
Facebook Disqus