বর্তমান বার্তা ডট কম / ০২ জুলাই ২০১৫ / শুভংকরের ফাঁকি ছিল দরপত্রের প্রক্রিয়াতেই। আর সে সুযোগ ষোলো আনা কাজে লাগানো হয়েছে পচা গম আমদানিতে। দরপত্রে অতিমাত্রায় কম মূল্য দেয়ার বিষয়টি আদৌ যাচাই করা হয়নি। শর্ত জুড়ে দেয়া হয়নি বিপুল পরিমাণ গম সম্ভাব্য কোন কোন দেশ থেকে আনতে হবে। দরপত্র প্রক্রিয়া ও পিপিআরের (সরকারের ক্রয় নীতিমালা) এ জাতীয় ফাঁক-ফোকর কাজে লাগিয়ে ৪০০ কোটি টাকার ২ লাখ টন নিুমানের গম সরবরাহ করেছে ইমপেক্স ইন্টারন্যাশনাল ও ওলাম ইন্টারন্যাশনাল নামের দুই বিদেশী প্রতিষ্ঠান। নিুমানের এ গমকেই ‘ভালো’ হিসেবে সনদ দিয়েছে খাদ্য অধিদফতরের নির্দিষ্ট পরীক্ষাগার।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিদেশ থেকে গম আমদানির দরপত্র আহ্বানের সময় ব্রাজিলে ভালো মানের প্রতি টন গমের রফতানি মূল্য ছিল ২৮৭ মার্কিন ডলার বা ক্ষেত্রবিশেষে তার চেয়ে কিছুটা বেশি। কিন্তু যে গম দেশে আনা হয়েছে সেটির মূল্য সর্বনিু ২৪০ ডলার থেকে শুরু করে আড়াইশ’ ডলারের কাছাকাছি। এত কম দামে ব্রাজিলের বাজারে ভালো মানের গম পাওয়াই যায় না। অথচ ওই দেশ থেকেই কম দামে অতি নিুমানের গম কিনে তা সরকারকে গছিয়ে দিয়েছে কোম্পানি দুটি। দরপত্রে উল্লিখিত দামে মানসম্পন্ন গম আমদানি করা যাবে কিনা এ বিষয়টি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনোরকম মনিটরিং করা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে মঙ্গলবার খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. কামরুল ইসলাম বর্তমান বার্তা ডট কমকে বলেন, ব্রাজিলের গমের বিষয়টি এখন বিচারাধীন। রোববার এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে শুনানি হবে। কাজেই বিচারাধীন বিষয় নিয়ে আমি কোনো কথা বলব না।
এদিকে পচা গম নিয়ে সর্বত্র আলোচনা ছড়িয়ে পড়লে খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো কথাই বলছেন না। সাংবাদিকদের যথাসাধ্য এড়িয়ে চলা হচ্ছে। মিডিয়াকে গম আমদানি, দরপত্রসংক্রান্ত কোনো তথ্য দেয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে গমের মান পরীক্ষা করা নিয়েও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা স্পষ্ট নয়। তবে নিুমানের গম সরবরাহের অপরাধে ইমপেক্স ইন্টারন্যাশনাল এবং ওলাম ইন্টারন্যাশনালের জমা রাখা পারফরমেন্স সিকিউরিটি (পিজি) বাজেয়াপ্ত করার চিন্তা চলছে। ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের বিপুল অংকের অর্থাৎ পিপিআরের নিয়ম অনুযায়ী মোট আমদানিকৃত পণ্য মূল্যের ১০ শতাংশ সরকারের কাছে জমা আছে। পচা গম সরবরাহের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার দিকেই হাঁটছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
অবশ্য সরকারের ক্রয় নীতিতে (পিপিআর) উল্লেখ রয়েছে পণ্য সরবরাহ দেয়ার জন্য কোনো কোম্পানি সরকারের সঙ্গে চুক্তি করার পর খারাপ পণ্য সরবরাহ কিংবা সরবরাহ দিতে বিলম্ব বা ব্যর্থ হলে ওই কোম্পানির নগদ জমা রাখা (পিজি) বাজেয়াপ্ত করা হয়।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এ গম আমদানির জন্য গত বছরের ২৭ নভেম্বর একাধিক জাতীয় দৈনিকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র অনুযায়ী প্রস্তাব দাখিল করতে ১৪ ডিসেম্বর সময় বেঁধে দেয়া হয়। দরপত্রে কার্যাদেশ দেয়ার ৪০ দিনের মধ্যে সরবরাহের কথা বলা হয়। ওই দরপত্রে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত গমে নষ্ট দানার পরিমাণ ৪ শতাংশ, ভাঙা দানার পরিমান ৫ শতাংশ, আর্দ্রতার পরিমাণ সাড়ে ১৩ শতাংশ, তাপমাত্রায় ক্ষতির পরিমাণ ন্যূনতম দশমিক ২ শতাংশ থাকার শর্ত দেয়া হয়। শর্ত দেয়া হয় গমে প্রোটিনের পরিমাণ কমপক্ষে ১০ শতাংশ ও ডোকেজ ১০ শতাংশ থাকতে হবে। কিন্তু গম আমদানির পর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, শর্তের সঙ্গে এসব উপাদানের মাত্রায় বাস্তবে যথেষ্ট গরমিল রয়েছে। মূলত নিুমানের কারণে অধিকাংশ শর্তই পূরণ হয়নি। গমে ভাঙা দানার পরিমাণ ৪ শতাংশের পরিবর্তে পাওয়া গেছে ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আর্দ্রতার পরিমাণ সাড়ে ১৩ শতাংশের পরিবর্তে পাওয়া গেছে ১১.১৫ শতাংশ।
নিুমানের গম আসার কারণে দরপত্রের শর্ত অনেক ক্ষেত্রেই লংঘিত হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বর্তমান বার্তা ডট কমকে বলেন, যেসব শর্ত দেয়া হয়েছিল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তা পূরণ করেই গম সরবরাহ করেছে। কিন্তু এই শর্তের মধ্যে সর্বনিু পর্যায়ের গম দেয়া হয়েছে, যা মোটেও কাম্য ছিল না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘একই বাজারে একটি শাড়ির দাম ৩ হাজার টাকা, অপরটির দাম ৩০০ টাকা। এখন ৩০০ টাকা দামের শাড়ি দেয়া হলেও লোকজন বলবে শাড়ি দেয়া হয়েছে। আবার ৩ হাজারের বেলায়ও একই কথা বলবে। গমের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমনই হয়েছে। গম দিতে বলা হয়েছে। গম দেয়া হয়েছে। কিন্তু গমের গুণাবলী ঠিক নেই।’
জানা গেছে, গম আমদানির বছরে অর্থাৎ ২০১৪ সালে ব্রাজিলে গমের বাম্পার ফলন হয়েছে। দেশটির সরকারি হিসাবে ৭৫ লাখ টন গম উৎপাদন হয়। বাম্পার ফলনের কারণে সেখানে গমের দাম কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সেখান থেকেই গম আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়। তবে কম মূল্যে ভালো গম না এনে, বেশি মুনাফা করতে নিুমানের গম কিনে সরবরাহ করেছে।
জানা গেছে, দেশের অন্যান্য সংস্থা এ ধরনের কেনাকাটার সময় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য নষ্ট হলে ফেরত নেয়ার গ্যারান্টি নিয়ে চুক্তি করে। কিন্তু উল্লিখিত দরপত্রে এ ধরনের কোনো শর্ত দেয়া হয়নি। এছাড়া খোঁজ নিয়ে সম্ভাব্য ভালো মানের গম উৎপাদনকারী একাধিক দেশের নামও উল্লেখ করা দেয়া যেত। দরপত্রের এসব দুর্বলতাই পচা গম আমদানির পথ সুগম করে দেয়। যা এখন কেলেংকারিতে রূপ
Post a Comment
Facebook Disqus