বার্তা প্রতিবেদন/২২ জুলাই২০১৬ /একটি শব্দই বাঁচিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৯৫ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ওই টাকা সাইবার অপরাধীদের হাতে যায়নি 'জুপিটার' শব্দ নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের 'অমূলক' সন্দেহের কারণে।
রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ স্থানান্তরের আদেশে 'জুপিটার' শব্দটি ফেডারেল রিজার্ভ কর্মকর্তাদের সন্দেহের কারণ ঘটায়। যদিও ঠিক যে কারণে তাদের সন্দেহ হয়েছিল, তা পরে ভুল প্রমাণিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নামে পাঠানো অর্থ স্থানান্তরের ওই আদেশগুলোতে নানা ধরনের অসামঞ্জস্য থাকলেও সেসব নিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ যে তেমন গুরুত্ব দেয়নি, উদ্যোগী হতে অনেক সময় নিয়েছে- তা উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।
৩৫টি ভুয়া সুইফট মেসেজে ফেডারেল রিজার্ভের পাঠানো এক বিলিয়ন ডলার স্থানান্তরের আদেশের মধ্যে অধিকাংশ আটকে গেলেও চারটি আদেশে ৮টি কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনে এবং একটি আদেশে দুই কোটি ডলার শ্রীলংকার একটি ব্যাংককে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
এছাড়া বানান ('Foundation' এর জায়গায় 'Fandation' লেখা ছিল) ভুলের কারণে সন্দেহ হওয়ায় শ্রীলংকায় যাওয়া টাকা আর অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি। কিন্তু ফিলিপাইনে যাওয়া অর্থের পুরোটাই স্থানীয় মুদ্রায় বদলে ফেলা হয় যার একটি বড় অংশ চলে যায় জুয়ার টেবিলে।
ইরানি তেলের ট্যাংকার বা জাহাজ কোম্পানি 'জুপিটারের' সঙ্গে এই রিজার্ভ চুরির কোনো যোগযোগ না থাকলেও ওই একটি শব্দেই আরও অর্থ ছাড়ের অনুরোধ আটকে যায়।
রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, হ্যাকারদের অর্থ স্থানান্তরের আদেশগুলেতে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা ফিলিপাইনের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকের জুপিটার শাখার কতগুলো অ্যাকাউন্টে জমা করতে বলা হয়েছিল।
কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার তালিকায় 'জুপিটার' নামে একটি অয়েল ট্যাংকার থাকায় ফেডারেল রিজার্ভ কর্মীদের সন্দেহ হয় এবং বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখতে শুরু করে।
অবশ্য তার আগেই পাঁচটি আদেশে ১০১ মিলিয়ন ডলার বেরিয়ে যায় ফেডরেল রিজার্ভের হাত থেকে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিউইয়র্ক ফেডের যে কর্মীরা ওই বিষয়টি দেখাশুনা করেন, তাদের একজন রয়টার্সের কাছে 'জুপিটার' বিভ্রান্তিতে ৯৫১ মিলিয়ন ডলার ছাড় আটকে যাওয়াকে 'অপ্রত্যাশিত সাফল্য' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রয়টার্স লিখেছে, তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের নামে যেসব অর্থ স্থানান্তরের অনুরোধ নিউইয়র্ক ফেডে পাঠিয়েছিল, সেগুলো ছিল অন্য অনুরোধের চেয়ে 'ব্যতিক্রমী'।
প্রথমত অর্থ স্থানান্তরের ওই অনুরোধ লেখার ক্ষেত্রে প্রচলিত কাঠামো অনুসরণ করা হয়নি। সেখানে অর্থ স্থানান্তরের অনুরোধ করা হয়েছিল ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত করে না।
রয়টার্স বলছে, 'সতর্ক সংকেত' পাওয়ার পরও নিউইয়র্ক ফেড প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বেশ ধীরগতিতে, যার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ প্রভাবশালী ইউনিটের মধ্যে যোগাযোগ ঘাটতি তৈরি হয়।
এই প্রতিবেদন তৈরির আগে রয়টার্সের প্রতিবেদকরা রিজার্ভ চুরির ঘটনার তদন্তকারী ও আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেছে, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তাদের মতামত নিয়েছে, পেমেন্ট মেসেজ, ইমেইল ও নথিপত্র দেখেছে।
রয়টার্স বলছে, বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দেখা গেছে ফেড কর্তৃপক্ষ আন্তঃব্যাংক যোগাযোগমাধ্যম সুইফট মেসেজিং সিস্টেমের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে বসেছিল; জরুরি পরিস্থিতির জন্য তারা পুরোপুরি প্রস্তুতও ছিল না।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের দুর্বলতা ও ঢিলেঢালা পেমেন্ট প্রক্রিয়ার কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের চুরি যাওয়া টাকাগুলোর হদিস কিছু বুঝে ওঠার আগেই মিলিয়ে যায়।
অর্থছাড় ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিকভাবে জালিয়াতি শনাক্তের ক্ষেত্রে নিউইয়র্ক ফেড কর্তৃপক্ষের যে দুর্বলতা রয়েছে তাও উঠে এসেছে রয়টার্সের অনুসন্ধানে।
অবশ্য ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো ত্রুটি থাকার কথা বারবার অস্বীকার করে আসছে। রয়টার্সের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নানা প্রশ্ন করা হলেও ফেড কর্তৃপক্ষ মন্তব্য করতে রাজি হয়নি তদন্তের কথা বলে।
অন্যদিকে রির্জাভ চুরি ঠেকাতে 'ব্যর্থতার' দায় নিউইয়র্ক ফেডের ওপর চাপিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনে টাকা ফেরত ও ক্ষতিপূরণের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছে। ওই ঘটনার জন্য সুইফটেরও দায় আছে বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা রয়টার্সকে বলেন, চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধারে ফেডের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে কাজ করছে। এর বাইরে আর কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি

Post a Comment
Facebook Disqus