সোনারগাঁ ২৪ ডটকমঃ কথায় আছে, বাপকা বেটা। এ ক্ষেত্রে বলতে হয়, দুলাভাইকা শালা। দুলাভাইটা সবারই চেনা- নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন। আর তাঁর শ্যালক নূর আলম খানও বিখ্যাত হওয়ার পথে। এলাকার লোকজন নূর হোসেনের সঙ্গে আত্মীয়তা ও তাঁর আশ্রয়-প্রশ্রয়ের প্রসঙ্গ টেনে এভাবেই নূর আলম খানের কুকীর্তির বর্ণনা দেয়।
নূর আলম খান নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। এলাকায় পরিচিতিও ব্যাপক। তবে রাজনীতি নয়, এই পরিচিতি নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য। ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, জমি দখল, ট্রাকস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, বালু ভরাটের কাজ নিয়ন্ত্রণ- এমন কাজগুলোয় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তাঁর বড় ঢাল হিসেবে কাজ করেছেন ভগ্নিপতি নূর হোসেন। তাঁর প্রভাবের কারণে কাঁচপুর থেকে মেঘনা ঘাট এলাকার কারো এই শ্যালক মহাশয়কে সমীহ না করে উপায় ছিল না।
পুলিশের তদন্ত এবং স্থানীয়দের অভিযোগে বেরিয়ে এসেছে ছাত্রলীগ নেতা নূর আলম খানের নানা অপকর্মের খতিয়ান।স্থানীয়রা তাঁকে শিমরাইল এলাকার গডফাদার নূর হোসেনের যোগ্য শ্যালক বলেই মনে করে। ভগ্নিপতির ম এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদে সোনারগাঁর কাঁচপুর এলাকায় বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন এই নূর আলম। চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারে রয়েছে তাঁর নিজস্ব বাহিনী। তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। তবে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে অপহরণের ঘটনা সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে।
ঢাকা রেলওয়ে থানা পুলিশ জানায়, গত ১ আগস্ট বিকেলে মালিবাগ লেভেলক্রসিংয়ে নূর আলম খানের প্রাইভেট কারটি বাধা উপেক্ষা করে রেললাইনে উঠে পড়লে চট্টলা এক্সেপ্রস সেটিকে ধাক্কা দেয়। এতে গাড়ির চার আরোহী গুরুতর আহত হন।পরে তাঁরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে গা-ঢাকা দেন। এদিকে গাড়ির মধ্যে গুলিসহ পিস্তল উদ্ধারের পর আহত যাত্রীদের খুঁজতে শুরু করে পুলিশ। রাতে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে এ আর রহমান আনসার নামে একজনকে পাওয়া যায়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আনসার জানান, গাড়িটি সাত খুনের আসামি নূর হোসেনের শ্যালক নূর আলম খানের।
ঢাকা রেলওয়ে থানার ওসি আব্দুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আনসার স্বাভাবিকভাবে কোনো কথা বলতে পারছে না। সে অনেকটাই অসুস্থ। তার কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে নূর আলমকে পাওয়া যায়নি। আমরা নূর আলম খানসহ দুজনকে খুঁজছি। তিনি জানান, দুর্ঘটনার ঘটনায় একটি মামলা এবং অবৈধভাবে নূর হোসেনের অস্ত্র বহনের পর উদ্ধারের ঘটনায় আরো একটি মামলা হয়েছে। দুই মামলায় নূর আলম ও আনসারকে আসামি করা হয়েছে।
নূর আলমের চাঁদাবাজির বাহিনী : স্থানীয় সূত্র জানায়, বিগত মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর কাঁচপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রয়াত আলহাজ মুসলিম খানের তৃতীয় ছেলে হাজি নূর আলম খান ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলেন। এই বাহিনীর মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবসায়ের নিয়ন্ত্রণ, কাঁচপুর ট্রাকস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, জমিজমা দখলসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ২০১২ সালে সোনারগাঁ উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ বাগিয়ে নেন তিনি।এরপর ভগ্নিপতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর হোসেনের ছত্রচ্ছায়ায় তিনি এলাকায় একক আধিপত্য গড়ে তোলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নূর আলম খান কাঁচপুর ও কুতুবপুর এলাকায় অর্ধশতাধিক শিল্পকারখানা দখল করে মাসে দুই কোটি টাকা আয় করতেন। কেউ টাকা না দিতে চাইলে চলত টর্চার সেলে নির্যাতন। আর টর্চার সেল হিসেবে তিনি ব্যবহার করতেন কাঁচপুর সিএনজি অ্যান্ড ফিলিং স্টেশনে নিজ অফিসের দ্বিতীয় তলা। সাধারণ মানুষ এত দিন ভয়ে মুখ খোলেনি। কুতুবপুর এলাকার আজিজুল হক, আব্দুল কাদির, সহিন মিয়া ও রাসেল ওরফে কাইল্লা রাসেল, মনির হোসেন, রাসেল ওরফে সুন্দর রাসেল,লিটন খান, উত্তম কুমার, রফিক মিয়া ওরফে ক্যাশিয়ার রফিক, আরিফ হোসেন, ফয়সাল খানসহ আরো অনেক ক্যাডার-সন্ত্রাসী দিয়ে নূর আলম খান একের পর এক অপকর্ম চালালেও র‌্যাব-পুলিশ এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
নূর হোসেনের অস্ত্র ও গাড়ি তাঁর কাছে : সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি আলাউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের ব্যবহৃত ছয়টি গাড়ি ও একটি অস্ত্র শ্যালক নূরে আলম খানের কাছে রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে কমলাপুর জিআরপি থানায় মামলা হয়েছে। আমরাও তদন্ত করছি।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘আমরা নোটিশ দেওয়ার পরও নূর হোসেনের লাইসেন্সকৃত দুটি অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি। মালিবাগে নূর আলম খানের গাড়িতে একটি অস্ত্র পাওয়া গেছে। বাকি অস্ত্রও তার কাছেই রয়েছে কি না খতিয়ে দেখা হবে।
ইসমাইলকে অপহরণের অভিযোগ : গত ৭ এপ্রিল নিখোঁজ হন সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ইসমাইল হোসেন।পরিবারের অভিযোগ, ঝুট ব্যবসা ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নূর আলম খান ভগ্নিপতি নূর হোসেনের মাধ্যমে র‌্যাবকে দিয়ে ইসমাইলকে গুম করেছেন। এসব অভিযোগ করায় অপহরণ মামলার বাদী ও ইসমাইলের ছোট ভাই আব্দুল মান্নানকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন নূর আলম খান। তিনি জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সোনারগাঁ থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছেন। ডায়েরিতে আব্দুল মান্নান উল্লেখ করেন, ‘শিল্প-কারখানায় এককভাবে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য আমার ভাইকে অপহরণ করে ছাত্রলীগ নেতা নূর আলম খান। তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে। এখন মামলা তুলে নেওয়ার জন্য সন্ত্রাসীরা আমাকে ও আমার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।
সূত্র জানায়, কাঁচপুর কুতুবপুর এলাকায় পারটেক্স, হরিপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র, হরিপুর ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্র, তৃপ্তি অয়েল মিল,অলিম্পিক কারখানা, নোকন ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ, লাফার্জ ইন্ডাস্ট্রিজ, অলিম্পিক ব্যাটারি, অলিম্পিক বলপেন, চায়না রি-রোলিং মিল, টাইস প্যাক, ইপিলিয়ন ফ্যাক্টরি, কিউট প্রসাধনী, এসএফ ফ্যাশন, অনন্ত গার্মেন্টস, রূপসা টাওয়ারসহ ২০-২৫টি শিল্প-কারখানা দখল করে ঝুট ও জমি কেনাবেচা ও বালু ভরাটের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন ইসমাইল হোসেন। এসবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নূর আলম খানের সঙ্গে ইসমাইলের কয়েকবার সংঘর্ষও হয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘ইসমাইল হোসেনের অপহরণের ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা নূর আলম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দলের নেতারা যা বলেন : অভিযোগের ব্যাপারে জানতে নূর আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর সহযোগীদের কয়েকজন জানান, সাত খুনের ঘটনার পরই মূলত গা-ঢাকা দেন নূর আলম। আর মালিবাগ লেভেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার পর তাঁর হদিস মিলছে না।
সোনারগাঁ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রাসেল মাহামুদ বলেন, ‘ছাত্রলীগের কোনো নেতা অন্যায় কাজে জড়িত থাকলে পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। নূর আলমের ব্যাপারে আমরা কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট শামসুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, ‘ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে নূর আলম খান কোনো অনিয়ম ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বিষয়টি প্রশাসন অবশ্যই দেখবে।

Post a Comment

Disqus