স্টাফ রিপোটার/বর্তমানবার্তা ডট কম / ৪ মার্চ২০১৫/বিশ্বের একটি বিলাস বহুল হোটেল হোটেল এর নাম ‘বুর্জ আল আরব’। এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে অবস্থিত। এটি বিশ্বের ৪র্থ উচ্চতম ভবন এবং বিশ্বের একমাত্র সাত তারকা বিশিষ্ট হোটেল। ‘বুর্জ আল আরব’ শুধুমাত্র দুবাই’য়ের নয় বরং সারাবিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল হোটেলের নাম। বুর্জ শব্দটার বাংলা অর্থ ‘স্তম্ভ’ কিংবা ইংরেজীতে ‘Tower’, বুর্জ আল আরব এর সম্পূর্ণ অর্থ দাঁড়ায় ‘আরবের স্তম্ভ’, সত্যই ভবনটি জুমেরিয়া বীচের পাড়ে আরবের বিলাস ও বিত্ত-বৈভবের প্রতীকি স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
টম রাইটের নকশাকৃত ৩২১ মিটার (৯১৯ ফিট) উচ্চতা বিশিষ্ট বিল্ডিং টি হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত ভবনগুলোর মাঝে চতুর্থ সর্বোচ্চ, জুমেরিয়া বীচের পাশে সমুদ্রের মাঝে একটি কৃত্রিম দ্বীপের উপর হোটেলটির অবস্থান। আরবের পুরনো পালতোলা জাহাজের কাঠামোর অনুকরণে বানানো ভবনটি আরবের ঐতিহ্যের প্রতিনিধি।
বুর্জ আল আরবের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। আরবের ‘দাউ’ নামক নৌযানের মাস্তুলের সাথে সাদৃশ্য রেখে এর কাঠামো নকশা প্রণয়ন করা হয়। মূল মাস্তুল কাঠামো থেকে ইংরেজী ‘V’ অক্ষরের মত এর কাঠামো দু’পাশে বিস্তৃত। সব মিলিয়ে কাঠামোগুলোর আবদ্ধ স্থানটি ত্রিভূজাকৃতির, ত্রিভূজের তিনবাহুর মধ্যবর্তী স্থলে আছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ আট্রিয়াম। ভবনটির স্থপতি জন রাইট এর সম্পর্কে বলেন, ‘ক্লায়েন্ট রা চেয়েছিলেন এমন কোন ভবন বানাতে যা প্রতীকি ও ঐতিহ্যগতভাবে দুবাইকে উপস্থাপন করবে, যেমনটি প্যারিসের আইফেল টাওয়ার কিংবা অস্ট্রেলিয়ার অপেরা হাউস করে থাকে। এটির এমন একটা বিল্ডিং হওয়ার কথা ছিলো যা দুবাই নামটির সমার্থক হয়ে যায়’।
ভবনটির স্থাপত্য পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ছিল অ্যাটকিনস্, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। নির্মাণ ঠিকাদারী ছিল সাউথ আফ্রিকান কন্ট্রাক্টর ম্যুরে এন্ড রবার্টস্ এর, এর প্রাক্কলিত নির্মাণ ব্যয় ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভবনটিতে কিছু বিশেষ সুবিধা যোগ করতে হয়েছে তাই এর নির্মাণ প্রক্রিয়া ছিল প্রকৌশল বিদ্যার জন্য জটিলতর এবং পরিশ্রমসাধ্য। হোটেল ভবনটি তীর থেকে ২৮০ মিটার দূরত্বে সমুদ্রের মাঝে একটি কৃত্রিম দ্বীপের উপর স্থাপিত।
বাহিরের কাঠামোটি মূলত কংক্রীটের টাওয়ারের মাঝে প্রোত্থিত স্টীলের কংকাল কাঠামো । ভবনটির বহির্ভাগকে দাউ নৌযানের পালের আকৃতি দিতে মূল মাস্তুল থেকে দুটি V আকৃতির কাঠামো দু’দিকে প্রসারিত। প্রসারিত কাঠামোর মধ্যভাগ টেফ্লন কোটেড ফাইবার গ্লাস দিয়ে আবদ্ধ। মূল মাস্তুল এবং পালের মধ্যকার অংশটি বেঁকে মধ্যভাগে একটি আট্রিয়াম সৃষ্টি করেছে। পালের অংশটি বানানো হয়েছে ডায়নিয়ন নামক উপাদান দিয়ে যা ঘিরে আছে প্রায় ১৬১,০০০ স্কয়ার ফিট এলাকা (১৫,০০০মিটার স্কয়ার), এতে আছে দুইটি পরত, এবং ১২ ভাগে বিভক্ত প্যানেলটি উল্লম্বভাবে স্থাপন করা হয়েছে। বহির্ভাগটি মরুভূমির তীব্র তাপমাত্রা সহনশীল করার জন্য ডুপন্ট টেফ্লন (DuPont Teflon) দিয়ে মোড়ানো, ফলস্বরূপ কর্তৃপক্ষ আশা করে ৫০ বছরের মধ্যে এর রঙ অনুজ্জ্বল হবেনা।
দিনের বেলায় এর মাঝ দিয়ে তীব্র আলোক রশ্মি কোমল কমনীয় রূপে পরিবর্তিত হয়ে প্রবেশ করে তীব্র আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়ার পরিবর্তে। রাতের বেলায় এর ভেতরে বাহিরে প্রক্ষেপণ করা হয় বর্ণিল পরিবর্তনশীল আলো। কেবল ২০০৬ সালে শেখ মাখতুম বিন রশীদ এর মৃত্যুর পর তার স্মরনে আলোক প্রক্ষেপণ বন্ধ রাখা হয়েছিল।
হোটেলটির ৮৭,০০০ স্কয়ার ফিট ২২ ক্যারেট সোনার পাত (Gold Leaf) দিয়ে মোড়ানো, প্রায় ৭২,০০০ স্কয়ার মিটার ৩০ ধরনের পাথর এবং মার্বেলে ঢাকা। লবিতে একটি ত্রিমাত্রিক কৃত্রিম ঝরনা স্থাপিত আছে যার আকৃতি ইসলামিক স্টারের মতো, এর একেকটি কোণা হোটেলটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থলের দিকনির্দেশ করে- তিনটি রেস্টুরেন্ট, গেস্টরুমের মধ্যকার করিডোর। এবং আট্রিয়ামের শীর্ষ মনে করিয়ে দেয় ক্লাসিক্যাল আরব্য আর্কিটেকচারাল ডিজাইন ফর্ম।পুরো ভবনটি বিশালাকৃতির হওয়া সত্ত্বেও এতে মাত্র ২৮ টি ফ্লোর আছে, প্রত্যেকটি ফ্লোর দোতলা। সবচেয়ে ছোট স্যুইট টির আকৃতি ১৮১৯ স্কয়ার ফিট এবং সবচেয়ে বড় স্যুইটটির আকৃতি ৮৩৯৬ স্কয়ার ফিট। এটি পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল হোটেল। স্যুইট গুলোর মূল্য শুরু হয় প্রতি রাত ১,০০০ ডলার থেকে ১৫,০০০ ডলার পর্যন্ত, রয়্যাল স্যুইটগুলো সবচেয়ে ব্যয়বহুল যাতে থাকতে প্রতি রাতে খরচ পড়বে ২৮,০০০ ডলার। প্রতিটি স্যুইট প্রাচ্যের আভিজাত্য আর পাশ্চাত্যের প্রযুক্তির মিশেলে তৈরী। মার্বেলে মোড়ানো সাদা টুসকান কলাম এবং সর্পিলাকার সিঁড়ি গুলো ক্লাসিসিজম এবং আর্ট ন্যূভো’র অনন্য দৃষ্টান্ত। স্পা-কর্ণারের সামান একেকটি বাথরূম মোজাইক করা মেঝে আর দেয়াল আরবী জ্যামিতিক ফর্মের প্রভাবে পেয়েছে শিল্পনিপুণ ছোঁয়া, সে আরবী জ্যামিতি’র প্রভাব ভবনের অন্যসব কোণেও খুঁজে পাওয়া যায়।
হোটেলের মধ্যকার একটি রেস্টুরেন্টের নাম ‘আল মুনতাহা’ (বাংলা অর্থ ‘সর্বোচ্চ’), এর অবস্থান পার্সিয়ান গালফের ২০০ মিটার উপরে, যেখান থেকে পুরো দুবাইকে চোখ বুলিয়ে দেখে নেয়া যায়। এটি একটি ক্যান্টিলিভারের উপরে স্থাপিত যেটি মাস্তুল থেকে ২৭ মিটার দূরে প্রসারিত, একটি প্যানারোমিক এলিভেটরে সেখানে যাওয়া যায়।আরেকটি রেস্টুরেন্টের নাম ‘আল মাহারা’ (বাংলা অর্থ ঝিনুক), যেখানে যেতে হয় একটি সিমুলেটেড সাবমেরিন ভয়েজের মাধ্যমে, এটি মূলত একটি বিশাল সমুদ্রের পানির এক্যুরিয়াম যেখানে প্রায় ৩৫,০০০ ঘন ফুট পানি আছে। পানির ট্যাঙ্কটি এক্রিলিক গ্লাসের তৈরী যেন তা ম্যাগনিফিকেশন এফেক্ট দূর করে, গ্লাসগুলোর পুরুত্ব ৭.৫ ইঞ্চি। হোটেলের পাশাপাশি এই রেস্টুরেন্টগুলোও বিশ্ববিখ্যাত এবং বিশ্বের সেরা ১০ রেস্টুরেন্টের মাঝে একটি। এখানে কাজ করেন বিখ্যাত শেফ কেভিন ম্যাকলোলিন।
বুর্জ আল আরবে আছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ আট্রিয়াম বিশিষ্ট লবি, ১৮০ মিটার (৫৯০ ফিট উচ্চতায়)। আট্রিয়ামটির অবস্থান ভবনটির V আকৃতির কাঠামোর মাঝখানে। আট্রিয়ামটিকে ঘিরেই হোটেলটির সম্পূর্ণ ইন্টেরিয়র ডিজাইন বিকশিত হয়েছে এবং আট্রিয়ামের ফাঁকা স্থানেই ইন্টেরিয়রের এক-তৃতীয়াংশ স্থান ব্যয় হয়েছে। আট্রিয়ামের জন্য যে ফাঁকা স্থান রাখা হয়েছে তাতে সহজেই দুবাই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বিল্ডিং টি এঁটে যেতো, যে ৩৮ তলা ভবনটি ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ এর দশক পর্যন্ত দুবাইয়ের সর্বোচ্চ ভবন ছিল। যে বুর্জ আল আরবের বাহিরের সাজসজ্জ্বা অত্যাধুনিক স্থাপত্যের নিদর্শন সেখানে এর অভ্যন্তরের অতিথিরা বিলাসবহুল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশেলে গড়া রাজকীয় অন্দরসজ্জ্বা উপভোগ করেন।
Post a Comment
Facebook Disqus